চিকিৎসা বিদ্যাবিজ্ঞানীদের জীবনীস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

“বিজ্ঞান যদি মানুষের কাজে না লাগে, তবে গবেষণার সার্থকতা নেই”

Share
Share

বিজ্ঞান গবেষণার সাফল্য আমরা প্রায়ই মাপি কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ হলো, কতটি জার্নালে ছাপা হলো, বা কতটি প্যাটেন্ট নেওয়া গেল—এই সংখ্যায়। কিন্তু ড. আবু খালেদের দৃষ্টিতে গবেষণার প্রকৃত সার্থকতা অন্য জায়গায়। তাঁর কথায়, “বিজ্ঞান যদি মানুষের কাজে না লাগে, তবে গবেষণার সার্থকতা নেই।” এই একটি বাক্যেই তাঁর গবেষণা দর্শনের সারকথা ধরা পড়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান তখনই অর্থবহ, যখন তার ফলাফল সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নত করে।

ড. খালেদের নিজের কর্মজীবনই এই দর্শনের বাস্তব উদাহরণ। উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বারবার বাংলাদেশের মতো দেশের বাস্তব সমস্যার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। আইসিডিডিআরবি-তে শিশুদের ডিহাইড্রেশন নির্ণয়ে BIA পদ্ধতির ব্যবহার তার একটি দৃষ্টান্ত। এটি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন নয়; এটি মাঠপর্যায়ে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

অনেক গবেষণা ল্যাবের দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। সেখানে নতুন তত্ত্ব তৈরি হয়, নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ হয় না। ড. আবু খালেদ এই প্রবণতাকে এক ধরনের “বিজ্ঞানী বিচ্ছিন্নতা” হিসেবে দেখেন—যেখানে গবেষণা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, উন্নয়নশীল দেশে এই বিচ্ছিন্নতা আরও বিপজ্জনক। কারণ এখানে মানুষের জীবনমান সরাসরি বৈজ্ঞানিক সমাধানের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি মনে করেন, গবেষণার শুরু থেকেই ব্যবহারিক দিকটি মাথায় রাখা জরুরি। যেমন, কোনো নতুন প্রযুক্তি তৈরি করার সময় ভাবতে হবে—এটি কি কম খরচে তৈরি করা সম্ভব? গ্রামীণ পরিবেশে বিদ্যুৎ না থাকলেও কি এটি কাজ করবে? স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা কি এটি সহজে ব্যবহার করতে পারবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে উন্নত প্রযুক্তিও শেষ পর্যন্ত সীমিত গণ্ডিতেই আটকে থাকবে।

ড. খালেদের অভিজ্ঞতায়, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতাও তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত থাকে। বিদেশের ল্যাবে বসে বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে ভাবা যেমন জরুরি, তেমনি সেই সমাধান দেশে এনে পরীক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে দেখা যায়—বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি কেবল জ্ঞান উৎপাদনেই সন্তুষ্ট নন, জ্ঞানের প্রয়োগ নিশ্চিত করাই তাঁর লক্ষ্য।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অনেক তরুণ বিজ্ঞানী আজ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা বা উচ্চতর ডিগ্রির দিকে বেশি মনোযোগী। ড. আবু খালেদের বার্তা হলো—এই অর্জনগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের দেশের বা সমাজের সমস্যার দিকেও চোখ রাখতে হবে। গবেষণার বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মানুষের উপকারের দিকটি বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের সমস্যা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে ব্যবহারিক বিজ্ঞানই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। ড. আবু খালেদের দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞান কেবল জ্ঞানচর্চার বিষয় নয়; এটি মানবকল্যাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। গবেষণা যদি মানুষের জীবনকে স্পর্শ না করে, তবে সেই গবেষণা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আর মানুষের কাজে লাগতে পারলেই বিজ্ঞান হয়ে ওঠে সত্যিকার অর্থে সমাজ বদলের হাতিয়ার।

ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org