রাত গভীর হলে রাজশাহীর কোনো এক মেসরুমে লাইট জ্বলে থাকে। পাশের ঘরগুলো অন্ধকার, কিন্তু এই এক ঘরে এখনো বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ। এক তরুণ চেয়ার টেনে বসে আছে, তার সামনে খোলা ল্যাপটপ, সার্চ বার খোলা। সে খুঁজছে শুধু তথ্য না, সে খুঁজছে নিজেকে। সে জানে, তার হাতে হয়তো একদিন সার্টিফিকেট থাকবে, কিন্তু সে নিশ্চিত না — সে নিজে কে হবে?
আমরা বড় হই পরিচয়ের ভিড়ে। কেউ বলে, “তুমি ভালো ছাত্র।” কেউ বলে, “তুমি ইঞ্জিনিয়ার হবে।” কেউ বলে, “বিদেশে না গেলে জীবন বৃথা।” এই সব পরিচয় আমাদের গায়ে চাপিয়ে দেওয়া জামার মতো। কিন্তু গবেষকের আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে এই জামা খুলে ফেলার সাহস থেকে। গবেষক হওয়া মানে কোনো ডিগ্রি লাগানো নয়, মানে নিজের ভেতর একটা বিরামহীন প্রশ্নচিহ্ন বয়ে বেড়ানো।
বাংলাদেশে গবেষকের পরিচয় অনেক সময়ই অসম্পূর্ণ থাকে। এখানে আমরা “মাস্টার্স শেষ করেছি” বা “পিএইচডি করছি”—এই বাক্যের মধ্যেই নিজেদের আটকে ফেলি। অথচ উন্নত বিশ্বে মানুষ প্রথমে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কী নিয়ে কাজ করেন?” আর বাংলাদেশে জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি কোথায় পড়েছেন?” এই ফারাকটা শুধু ভাষার না, ফারাকটা মানসিকতার।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, যে দেশগুলো গবেষণাকে পেশার চেয়ে পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্ব দিয়েছে। জাপানে একজন গবেষক তার পরিচয় দেন তার প্রজেক্ট দিয়ে, জার্মানিতে দেন তার সমস্যার ক্ষেত্র দিয়ে, আর আমরা দিই সার্টিফিকেটের কভার পেজ দিয়ে।
একজন গবেষক মানে এমন কেউ, যিনি প্রশ্ন চালিয়ে নেন নিজের জীবন দিয়ে। তার কথাবার্তায় থাকে কৌতূহল, তার নীরবতায় থাকে চিন্তা, তার কাজে থাকে সততা। তিনি যখন লেখেন, তখন নিজের নাম লিখতে ভয় পান। কারণ নামটা ওজনদার হয়ে উঠতে সময় লাগে। একজন গবেষক জানেন, নাম নয়, কাজই একদিন নাম বানায়।
জগদীশচন্দ্র বসু যখন উদ্ভিদের জীবনের কথা বলছিলেন, তখন অনেকে হাসছিল। কিন্তু তিনি নিজের পরিচয় বানালেন হাসির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে।
তোমার আত্মপরিচয় গড়ার জায়গা ল্যাব না, লাইব্রেরি না, তোমার মন। তুমি যখন কোনো সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাও, তখন তুমি নিজের পরিচয় ফেলে যাও। আর যখন তুমি সাহস করে বলো, “আমি জানি না, আমি জানবো”—তখন তুমি গবেষক হয়ে উঠো।
আধুনিক যুগে গবেষকের আত্মপরিচয় শুধু কাগজে নয়, অনলাইনে, কথোপকথনে, নেটওয়ার্কে। তুমি কী পড়ছ, কী লিখছ, কী শেয়ার করছ—তোমার ডিজিটাল ছায়াই তোমাকে চেনে। বিশ্বজুড়ে আজ গবেষকদের সবচেয়ে বড় পোর্টফোলিও হলো তাদের কাজের দৃশ্যমানতা। কিন্তু আমরা এখনো ভাবি, ভালো কাজ মানেই লোক জানবে। ভুল। আজ জানাতে না পারলে, থাকা মানেই না থাকা।
তবু আত্মপরিচয় মানে নিজের বিজ্ঞাপন দেওয়া না। আত্মপরিচয় মানে নিজের মান ঠিক রাখা। তুমি যদি কোনো ফলাফল বানাও, না পাওয়া তথ্য ঢাকো না, কপি করো না, নিজের কাজের সীমা স্বীকার করো—এটাই তোমার চরিত্র। আর গবেষকের চরিত্রই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বাংলাদেশে গবেষক হওয়া মানে একটু একা হওয়া। বন্ধুদের আলাপ বদলাবে, পরিবার বোঝাবে না, সমাজ প্রশ্ন তুলবে। এই একাকীত্ব মেনে না নিলে গবেষণা হয় না। কিন্তু এই একাকীত্বই একদিন তোমাকে সবার মাঝে দাঁড় করায়।
নিজেকে জিজ্ঞেস করো, তুমি কী চাও—মাসিক বেতন, না অর্থপূর্ণ জীবন? স্বীকৃতি, না সত্য? দ্রুত ফল, না গভীর কাজ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই তোমার আত্মপরিচয় গড়ে উঠছে।
একদিন, তোমার ডিগ্রিগুলো ধুলা হবে, অফিস বদলাবে, প্রফেসর বদলাবে। কিন্তু তুমি যদি সত্যিকার অর্থে গবেষক হও, তোমার কৌতূহল কখনো বদলাবে না। সেটাই তোমার আসল পরিচয়।
এই মুহূর্তে তুমি হয়তো অজানা, নামহীন। কিন্তু প্রতিটা রাত তুমি যেভাবে চিন্তা করো, লেখো, প্রশ্ন করো—সেখানে লুকিয়ে আছে তোমার ভিজিটিং কার্ড।
বিজ্ঞানীর পরিচয় পোস্টারে লেখা থাকে না, সে লেখা থাকে তার কাজের ছায়ায়।

Leave a comment