প্লেজারিজম: যে চুরি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভবিষ্যৎটা গুম করে দেয়
রাতের শেষ প্রহর। ঢাকার কোনো এক মেসরুমের জানালা খোলা। বাইরে রিকশার ঘণ্টা, ভেতরে ল্যাপটপের নীল আলো। এক তরুণ ছাত্র বসে আছে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, চোখ লাল, মাথা ভারী। কাল তার সেমিনার পেপার জমা দিতে হবে। সে গুগলে সার্চ করে, কপি করে, পেস্ট করে। কয়েকটা লাইন এদিক-ওদিক বদলায়। মনে মনে ভাবে, “আর কয়জনই বা দেখবে?” সে জানে না, এই কয়েকটা কপি করা লাইন তার পুরো ভবিষ্যতের দিকে এমন একটা দাগ টেনে দিচ্ছে, যেটা ধুয়ে ফেলা যায় না।
এই নীরব চুরির নাম প্লেজারিজম। না, এটা স্রেফ নকল নয়, এটা কারও চিন্তা চুরি করা, কারও রাত জাগার শ্রম নিজের নামের নিচে বসানো। সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, প্লেজারিজমের শব্দটা অনেকেই জানে, কিন্তু এর মর্মটা বোঝে না। অনেকের কাছে এটা এমন এক ‘ছোটখাটো ট্রিক’, যা পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেয়, এসাইনমেন্ট শেষ করে দেয়। অথচ বাস্তবে এটা এক ধরনের চিন্তাগত আত্মহত্যা। তুমি যখন অন্যের ভাবনাকে নিজের নামে চালাও, তখন তুমি আসলে নিজের মগজটা ব্যবহার না করার অভ্যাস তৈরি করো। এবং যে মগজ কাজ না করে, তার ভবিষ্যৎও কাজ করে না।
বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় এই প্রবণতা যেন এক অদৃশ্য মহামারি। ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রী বেশি, সময় কম, শিক্ষক ক্লান্ত। দ্রুত ফলাফল চাই, কিন্তু গভীরতা চাওয়ার সময় নেই। ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষ থেকেই দেখা যায়, “ভাই, আগের ব্যাচের এসাইনমেন্টটা দে”, এই কথাটা যেন স্বাভাবিক ভাষা। অথচ কেউ জিজ্ঞেস করে না, “এই কাজটা করে আমি কী শিখছি?” বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় শেখার চেয়ে সার্টিফিকেটের গুরুত্ব বেশি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশও এই ছবির বাইরে নয়। সংখ্যায় আমরা এগোচ্ছি, কিন্তু চিন্তায় পিছিয়ে পড়ছি।
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই কেবল ডিগ্রি নয়, বিশ্ববিদ্যালয় মানে মন গঠনের কারখানা। এখানে চুরি শেখা মানে নিজের মেরুদণ্ড ভাঙা শেখা। মজার ব্যাপার হলো, অনেক ছাত্র ভাবেন, প্লেজারিজম ধরা পড়বে না। কিন্তু এই “ধরা পড়বে না” ভাবনাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। উন্নত বিশ্বে এখন সফটওয়্যার আছে, যেটা কেবল কপি ধরা নয়, লেখার স্টাইল দেখে লেখক চিনে ফেলার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক ইন্টেগ্রিটি এখন চাকরির চেয়েও বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার প্লেজারিজমে ধরা পড়লে, তা ট্রান্সক্রিপ্টে স্থায়ী দাগ হয়ে থাকে। ঐ দাগের সামনে সব সিজিপিএ ফিকে হয়ে যায়।
UNESCO-র গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় প্লেজারিজম করেছে, ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে। এখানে অনিচ্ছাকৃত কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই জানে না, কীভাবে চিন্তা ধার করতে হয়, কীভাবে নিজের ভাষায় রূপ দিতে হয়। স্কুল থেকে আমরা কোটেশন শিখিনি, রেফারেন্স শিখিনি, শিখেছি মুখস্থ। সেই মুখস্থই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আধুনিক পোশাক পরে—নামে হয় প্লেজারিজম।
প্লেজারিজম সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে কোথায়, জানো? চরিত্রে। যখন তুমি অন্যের ভাবনা নিজের নামে চালাও, তখন তুমি নিজের সঙ্গে একটা মিথ্যে শুরু করো। তুমি নিজেকেই বোঝাতে থাকো, “আমি পারছি।” অথচ আসলে তুমি পারছ না, তুমি ঢাকছ। এই ঢাকতে ঢাকতেই একটা সময় আসে, যেদিন তুমি নিজেই বুঝে ওঠো না, তুমি কোথায় থামবে। গবেষণায় যেমন, তেমনি জীবনে। কেউ তোমাকে বিশ্বাস করে না, আর তুমি নিজেকে বিশ্বাস করতে ভুলে যাও।
এক সময় ছিল, যখন নিউটন বলেছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন দৈত্যদের কাঁধের উপর। এই কথাটার ভেতরেই আসলে প্লেজারিজম এড়ানোর চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞান মানে অন্যের কাজের উপর দাঁড়ানো, কিন্তু নিজের নামের ছায়া না মুছা। মেরি কুরি তার আবিষ্কারে আগের বিজ্ঞানীদের নাম গোপন করেননি, আইনস্টাইন তার থিওরিতে আগের চিন্তাবিদদের অবদান ভুলে যাননি। কারণ বিজ্ঞান হলো আলো, সেখানে অন্ধকার করে নিজের নাম লেখা যায় না।
বাংলাদেশের গর্ব আবদুস সালাম যখন বিশ্বে আলো ছড়ালেন, তখন তিনি নিজের দেশকেও সঙ্গে করে নিলেন। তাঁর মতো মানুষ কখনো অন্যের আলো চুরি করেননি, বরং নিজের আলো জ্বালিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই আলোর উত্তরাধিকারী হতে চাই, না আমরা ছোট ছোট চুরি করে বড় স্বপ্নের কবর দিতে চাই?
প্লেজারিজম এড়ানো কোনো নিয়ম মুখস্থ করার বিষয় না, এটা মানসিকতার প্রশ্ন। এটা নিজেকে সম্মান করার ভাষা শেখা। তুমি যদি জানো, তোমার চিন্তাও দামের জিনিস, তাহলে তুমি কখনো অন্যের চিন্তা চুরি করবে না। তুমি শিখবে কিভাবে পড়তে হয়, কিভাবে বুঝতে হয়, কিভাবে নিজের ভাষায় বলেতে হয়। এতে সময় লাগবে, কষ্ট হবে, কিন্তু এই কষ্টটাই তোমাকে তৈরি করবে।
বাংলাদেশে গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেশের জিডিপির খুব সামান্য অংশ। OECD দেশগুলো সেখানে গড়ে ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করে গবেষণায়, আর আমরা লড়াই করি কপি-পেস্ট রাজনীতিতে। অথচ আমরা যদি এই সামান্য সম্পদের মধ্যেও চিন্তার সততা বজায় রাখতে পারতাম, তাহলে এই দেশই একদিন আইডিয়া এক্সপোর্ট করত।
তোমাকে কেউ বলবে না, “হে ছাত্র, প্লেজারিজম করোনা।” তোমাকে সেটা নিজেই বুঝতে হবে। বুঝতে হবে যে, এই পথে হাঁটলে ডিগ্রি হয়তো পাবা, কিন্তু পরিচয় পাবে না। তুমি যদি সত্যিই বিজ্ঞানী হতে চাও, চিন্তাবিদ হতে চাও, তাহলে প্রথম শর্ত হলো, নিজের কণ্ঠ চিনে ফেলা। নিজের ভাষায় ভাঙা ভাবনা, অসম্পূর্ণ বাক্য, অগোছালো যুক্তি নিয়েও সত্যের পথে হাঁটতে পারাই আসল সাহস।
একদিন, অনেক বছর পর, হয়তো তুমি কোনো ল্যাবে, কোনো অফিসে, কিংবা কোনো ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে বলবে, “স্যার, আপনার কাজটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।” সেই মুহূর্তে তুমি যদি জানো, এই কাজ তোমার নিজের, তখন বুকটা হালকা হবে। আর যদি জানো, এটা আসলে অন্যের, তখন সেই মুহূর্তটাই হবে তোমার সবচেয়ে ভারী বোঝা।
প্লেজারিজম এড়ানো মানে শুধু নিয়ম মানা না, নিজেকে বাঁচানো। নিজের চিন্তাকে মূল্য দেওয়া। সেই তরুণটির মতো যেন আর কেউ গভীর রাতে নিজের ভবিষ্যৎ কপি করে না। বরং নিজের মতো করে লিখে নেয় নিজের গল্প।
এই দেশটাকে বিজ্ঞানী দরকার, কপিকার দরকার না। চিন্তাবিদ দরকার, চোর নয়। আর তোমার মতো একজন পাঠকই সেই নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা।

Leave a comment