আধুনিক বিশ্বে নেতৃত্বের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় নেতৃত্ব মানেই ছিল নির্দেশ দেওয়া, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং শীর্ষে বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু গবেষণা, শিক্ষা, প্রযুক্তি কিংবা করপোরেট—সব ক্ষেত্রেই আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে টেকসই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সহযোগিতাভিত্তিক নেতৃত্ব। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিমের একটি সহজ অথচ গভীর উক্তি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে—“বেশি কথা নয়, বেশি শোনা—এইভাবেই দল গড়ে ওঠে।”
এই কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে নেতৃত্বের এক মৌলিক দর্শন। একজন নেতা যখন বেশি কথা বলেন, তখন তিনি নিজের ভাবনাকেই প্রাধান্য দেন। কিন্তু বেশি শোনা মানে অন্যদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া। গবেষণাগারে একজন শিক্ষার্থী নতুন কোনো ধারণা নিয়ে এলে, অথবা একজন জুনিয়র গবেষক কোনো সমস্যার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলে—সেই কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা না হলে উদ্ভাবনের পথ অনেক সময়ই বন্ধ হয়ে যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এসেছে এমন ‘শোনা’র সংস্কৃতি থেকেই, যেখানে সিনিয়ররা জুনিয়রদের প্রশ্নকে অবহেলা করেননি।
শোনা মানে শুধু নীরব থাকা নয়; বরং সক্রিয়ভাবে বোঝার চেষ্টা করা। একজন শিক্ষক যদি তাঁর শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তবে তিনি পাঠদানের পদ্ধতিও সেই অনুযায়ী বদলাতে পারেন। একজন প্রশাসক যদি শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনগুলো বোঝেন, তবে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলাও সহজ হয়। ডক্টর করিমের অভিজ্ঞতায়, বড় গবেষণা দল পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা জরুরি, ততটাই জরুরি দলসদস্যদের কথা মন দিয়ে শোনা।
দল গঠনের ক্ষেত্রে এই শোনার সংস্কৃতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দল মানে কেবল কয়েকজন দক্ষ মানুষের সমষ্টি নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের একটি কাঠামো। যখন কেউ অনুভব করেন যে তাঁর কথা শোনা হচ্ছে, তখন তাঁর মধ্যে দায়িত্ববোধ ও অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়ে। এতে করে দলটি কেবল নির্দেশনাভিত্তিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে একটি সৃজনশীল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। যেমন একটি গবেষণা প্রকল্পে বিভিন্ন বিভাগের মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে, প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হতে পারে। সেই ভিন্নমতগুলো শোনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই নতুন সমাধান জন্ম নেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দর্শনের গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন-নিম্নতন বিভাজন স্পষ্ট। তরুণ গবেষক বা শিক্ষার্থীরা অনেক সময় তাঁদের মতামত প্রকাশে সংকোচ বোধ করেন। যদি নেতৃত্বের জায়গায় থাকা মানুষগুলো সচেতনভাবে ‘বেশি শোনার’ সংস্কৃতি গড়ে তোলেন, তবে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ অনেক বেশি উন্মুক্ত ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব মানে কেবল সামনে থেকে পথ দেখানো নয়; কখনো কখনো পেছনে দাঁড়িয়ে অন্যদের এগিয়ে যেতে জায়গা করে দেওয়া। “বেশি কথা নয়, বেশি শোনা”—এই নীতিটি কেবল একটি উক্তি নয়, বরং কার্যকর দল গঠনের এক শক্তিশালী কৌশল। ভবিষ্যতের বাংলাদেশি গবেষক, শিক্ষক ও নেতৃত্বস্থানীয়দের জন্য এই দর্শন হতে পারে একটি নীরব কিন্তু দৃঢ় পথনির্দেশক।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment