এক গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক হলের বারান্দায় এক ছাত্র বসে আছে। সামনে খোলা খাতা, পাশে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা। পরীক্ষাটা সে ভালো দেয়নি। গবেষণার প্রজেক্টটা আবার ফিরে এসেছে লাল কালি ভরা মন্তব্য নিয়ে। মাথার ভেতর বারবার একটা প্রশ্ন ঘুরছে — “আমি কি আসলেই পারছি?” এই প্রশ্নটাই, অবাক করা হলেও, অনেক বড় বিজ্ঞানীর যাত্রা শুরু করেছে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভুল শব্দটাই যেন অপরাধের মতো। ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়েছে, ভুল মানেই ফেল, লজ্জা, ধমক। আমরা বড় হই এই ভয়ে যে, একবার ভুল করলে জীবন শেষ। অথচ বিজ্ঞানী হওয়া মানেই ভুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। বিজ্ঞান মানে নিশ্চিত হওয়া না, বিজ্ঞান মানে বারবার ভুল করে একটু একটু করে সঠিকের কাছে যাওয়া।
ভাবো তো, থমাস এডিসন তার বাতি বানাতে গিয়ে কতবার ব্যর্থ হয়েছেন? হাজারবারেরও বেশি। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, তিনি ব্যর্থ হননি, তিনি হাজারটা উপায় খুঁজে পেয়েছেন যেগুলো কাজ করে না। এই মনোভাব আমাদের ক্লাসরুমে শেখানো হয় না। বরং শেখানো হয়, প্রথমেই সঠিক হও। কিন্তু সত্যি কথা হলো, প্রথমেই সঠিক হওয়া বিজ্ঞানীর কাজ না, বিজ্ঞানীর কাজ ভুল করে জ্ঞান জমানো।
বিশ্বের বড় বড় ল্যাবগুলোতে ব্যর্থতা নোটবুকের পাতায় লেখা থাকে সাফল্যের মতোই যত্নে। কারণ প্রত্যেকটি ব্যর্থতা মানে একটা নতুন তথ্য। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ একটি গবেষণায় বলেছে, যেসব দল ব্যর্থতাকে খোলামেলা আলোচনা করে, তারা অন্যদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি উদ্ভাবনী হয়। ব্যর্থতা গোপন করলেই সে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ভুলকে লুকালে সে বিষ হয়, প্রকাশ করলে সে ওষুধ হয়।
বাংলাদেশে আমরা ভুল স্বীকার করতে ভয় পাই। ছাত্র বুঝতে পারে না, শিক্ষক স্বীকার করেন না, প্রতিষ্ঠান ঢেকে রাখে। সমাজে যেন সবাই নিখুঁত হওয়ার নাটক করছে। এই নাটকটাই আমাদের থামিয়ে রাখে। অথচ উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “Fail fast” শব্দটা সম্মানের। দ্রুত ভুল করো, দ্রুত শেখো, দ্রুত এগোও। আমাদের এখানে ভুল করো না, এটাই নীতি। ফলাফল হলো, কেউ ঝুঁকি নেয় না, কেউ নতুন কিছু করে না।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখবে, ভুল ছাড়া আবিষ্কার নেই। পেনিসিলিন আবিষ্কারের গল্পটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং একদিন দেখলেন, পরীক্ষাগারে রাখা একটি প্লেটে ছত্রাক লেগেছে, আর সেই “ভুল” থেকেই জন্ম নিল প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক। ভাবো, তিনি যদি সেটা ফেলেদিতেন এই ভেবে যে, “পরীক্ষা নষ্ট হয়ে গেছে”, তাহলে কি আজ কোটি মানুষ বাঁচত?
এখানেই বিজ্ঞানীর আলাদা গুণ। যেখানে অন্যরা থামে, বিজ্ঞানী সেখানে থামেন না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “এর মানে কী?” ভুল তার কাছে দেয়াল না, দরজা। আর এই দরজা দিয়েই সে ঢুকে পড়ে নতুন ঘরে।
UNESCO-র এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যে শিক্ষার্থীরা ট্রায়াল-অ্যান্ড-এরর পদ্ধতিতে শেখে, তাদের সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি হয়। কারণ তারা ভয় পায় না। তারা জানে, প্রতিটি ভুল মানে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
ভুলের ভয় আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই ভয়ই আমাদের নকল করতে শেখায়, নীরব থাকতে শেখায়, নিরাপদ পথে হাঁটতে শেখায়। কিন্তু নিরাপদ পথ কখনো নতুন জায়গায় পৌঁছায় না। নিউটন যদি ভুলের ভয়ে আপেলের দিকে না তাকাতেন, ডারউইন যদি সমালোচনার ভয়ে তার ধারণা না লিখতেন, আইন্সটাইন যদি স্কুলের খারাপ রেজাল্টে থেমে যেতেন, তাহলে আজ বিজ্ঞানের মুখটাই অন্যরকম হতো।
তুমি হয়তো ভাবছ, “এই গভীর গল্পগুলো বড় মানুষদের, আমার সঙ্গে কী সম্পর্ক?” সম্পর্ক খুব সহজ। তুমি যদি আজ ক্যাম্পাসে একটা প্রজেক্টে ভুল করো, আজ পরীক্ষায় কম নাম্বার পাও, আজ কোনো আইডিয়া ফেল করে — এই সবগুলোই তোমার প্রশিক্ষণ। সমস্যা তখনই, যখন তুমি ভেঙে পড়ো, শিখো না।
বিজ্ঞানী হওয়া মানে নিখুঁত হওয়া না, মানে সহনশীল হওয়া। নিজের ভুলকে বোঝার শক্তি, নিজের অহংকে ভাঙার সাহস, নিজের সীমা মানার জ্ঞান — এগুলোই একজন বিজ্ঞানীর আসল সম্পদ।
বাংলাদেশে আজও “ভালো ছাত্র” মানে কম ভুল করা ছাত্র। কিন্তু আমাদের দরকার “ভালো চিন্তাবিদ”, যে বেশি প্রশ্ন করবে, বেশি ঝুঁকি নেবে, বেশি ভুল করবে।
এই দেশটার বিজ্ঞানী চায় নিখুঁত মুখ নয়, চায় সাহসী মন। যে মন জানে, ভুল মানেই শেষ না, ভুল মানেই শুরু।
তাই আজ যদি তুমি ব্যর্থ হও, নিজেকে ব্যর্থ ভেবো না। ভাবো, তুমি ট্রেনিংয়ে আছ। আজ যে ভুলটা করলে, সেটা হয়তো কাল তোমার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।
আর একদিন, অনেক বছর পর, কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি এতদূর এলে কীভাবে?” তুমি হয়তো হাসবে আর বলবে, “ভুল করতে করতে।”

Leave a comment