তুমি যখন বিজ্ঞানীর নাম শোনো, তখন হয়তো চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা কোট পরা একজন মানুষ, হাতে টেস্ট টিউব বা কম্পিউটারের সামনে ডেটা বিশ্লেষণ করছে। কিন্তু বিজ্ঞানীর কাজ আসলে এর চেয়েও অনেক বিস্তৃত এবং মানবিক। বিজ্ঞান মানে কেবল কঠিন সূত্র, জটিল যন্ত্রপাতি বা গবেষণাগারের ভেতর গন্ধমাখা রাসায়নিক নয়। বিজ্ঞান মানে নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা সয়ে নেওয়ার শক্তি, আর অজানাকে জানার এক অদম্য যাত্রা।
সকালে একটি বিজ্ঞানীর দিন শুরু হয় হয়তো অন্য সবার মতোই। নাস্তা সেরে যখন সে ল্যাবে যায়, তখন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে আগের দিনের পরীক্ষার ফলাফল। হয়তো মাইক্রোস্কোপে দেখা কোষ বিভাজন প্রত্যাশামতো হয়নি, কিংবা কম্পিউটার মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব ডেটার সঙ্গে মেলেনি। এসব ভাবতে ভাবতেই আবার শুরু হয় দিনের কাজ। একজন জীববিজ্ঞানী হয়তো পেট্রিডিশে নতুন কোষ কালচার করছেন, একজন পদার্থবিদ লেজার মেশিন চালু করছেন, আর একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী মডেলের কোডে নতুন অ্যালগরিদম বসাচ্ছেন।
তুমি যদি ভেবে থাকো বিজ্ঞানীরা সব জানেন, তবে ভুল করবে। আসলে তারা প্রতিদিনই অজানার সঙ্গে লড়াই করেন। অনেক সময় একই পরীক্ষা শতবার করতে হয়, কখনো ফল মেলে না। কিন্তু বিজ্ঞানীর শক্তি হলো—হাল না ছাড়া। একজন গবেষক হয়তো জানেন, আজ ব্যর্থ হলেই কালকের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হবে। তুমি যে প্রতিটি বড় আবিষ্কারের কথা পড়ে এসেছো—নিউটনের গতি সূত্র, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা, কিংবা হিগস বোসনের সন্ধান—এসবই এসেছে হাজারো ছোট ব্যর্থতা আর ধৈর্যের সিঁড়ি বেয়ে।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও একইভাবে কাজ করেন। কেউ হয়তো নদীর পানির মান পরীক্ষা করছেন, কেউ মশাবাহিত রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন, কেউ আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কৃষির সমস্যার সমাধান খুঁজছেন। এই গবেষণাগুলো হয়তো এখনো নিউটনের সূত্রের মতো বিশ্বকে বদলে দেয়নি, কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধান করছে। তুমি হয়তো ভাবছো, এত সীমিত যন্ত্রপাতি আর অর্থনৈতিক চাপে তারা কীভাবে এগিয়ে যান? উত্তর একটাই—অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
একজন বিজ্ঞানীর দিন কখনোই আট ঘণ্টার চাকরির মতো নয়। রাতের শেষ প্রহরেও তারা ল্যাবে ফিরে আসতে পারেন, কেবল একটি ফলাফল যাচাই করার জন্য। অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোও ত্যাগ করতে হয়। তবু তারা হাসিমুখে কাজ চালিয়ে যান, কারণ তাদের কাছে বিজ্ঞান মানে কেবল পেশা নয়, একধরনের ভালোবাসা।
বিজ্ঞানী অর্গ-এ আমরা যেসব সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তার ভেতর দিয়ে তুমি এই মানবিক দিকটা দেখতে পারবে। হয়তো একজন গবেষক বলবেন কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, আরেকজন শোনাবেন কিভাবে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ না পেয়েও নিজের সীমিত সম্পদে বড় গবেষণা করেছেন। এ গল্পগুলো শুধু বিজ্ঞান নয়, জীবন সংগ্রামেরও গল্প। আর এই গল্পগুলো তোমাকে শেখাবে, বিজ্ঞানী হওয়া মানে শুধু প্রতিভা নয়, অধ্যবসায় আর সততাও।
তুমি যদি বিজ্ঞানী হতে চাও, তবে শুরু করতে হবে ছোট থেকে। কৌতূহল জাগাও, প্রশ্ন করো, বই পড়ো, আর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হাত লাগাও। বড় আবিষ্কার একদিনে হয় না, কিন্তু প্রতিদিন ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই একদিন তা বড় হয়ে ওঠে। মনে রেখো, বিজ্ঞানীরা জন্মগতভাবে আলাদা কেউ নয়, তারা আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। পার্থক্য শুধু তারা অজানার পথে হাঁটতে সাহস করেছে।
শেষ পর্যন্ত, বিজ্ঞানীরা কিভাবে কাজ করেন তা বোঝা মানে কেবল তাদের ল্যাবের যন্ত্রপাতি দেখা নয়, তাদের মনের ভেতরের আগুনটা বোঝা। সেই আগুনই তাদের বারবার ব্যর্থতার পরও দাঁড় করায়, নতুন পথ খুঁজতে শেখায়। আর একদিন সেই আগুনই আলো ছড়ায় সমগ্র সমাজে। তাই বিজ্ঞানীদের গল্প শোনো, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখো, আর নিজের ভেতরেও সেই আগুনটা জ্বালিয়ে তোলো। কারণ আগামী দিনের বিজ্ঞানী তুমি-ই হতে পারো।

Leave a comment