মর্যাদা

সময়টা পড়ন্ত বিকেল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। একটা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত জনশূন্য রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টগুলোর কয়েকটিতে আলো জ্বললেও হয়ত খারাপ হয়ে যাওয়ার দরুণ বেশ কয়েকটিতে আলো জ্বলছে না। রাস্তাটি ধরে দূর থেকে একটা ছায়ামূর্তি ধীর গতিতে হেঁটে আসছে। তার মাথায় ছাতা নেই। ছায়ামূর্তিটির হাঁটা বেশ এলোমেলো। ছায়ামূর্তিটি যখন একটা মনুষ্য রূপে পরিবর্তিত হয়েছে, তখন দেখা গেল যে একটা পনেরো-ষোলো বছর বয়সী মেয়ে জিন্স আর টপ্ পরে বেসামাল পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। তার জিন্স এর দুই পায়ের হাঁটুর খানিকটা ছেঁড়া যা নিতান্তই আধুনিক ফ্যাশন বলেই মনে হয়, কিন্তু তার টপের ছেঁড়া অংশগুলো বেশ সন্দেহের জন্ম দেয়। টপের কয়েকটা ছেঁড়া অংশের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার ক্ষত-বিক্ষত ত্বক। দৃঢ়ভাবে চলার চেষ্টায় তার কোন ত্রুটি নেই, কিন্তু এক ভীষণ যন্ত্রণায় নীচু হয়ে সে বার বার তার তল পেট দুহাতে চেপে ধরছে। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ল। বৃষ্টির প্রচণ্ড ঝম্ঝম্ শব্দে তার মুখ নিঃসৃত আর্তস্বর নিতান্তই অবহেলিত। সেই উপুর অবস্থা থেকে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব ঠেকল। সে রাস্তার উপরই উপুর অবস্থা থেকে দুই হাত ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে। ক্লান্তিতে তার দুচোখের পাতা এক হতে চায়। তার মুখে নিরন্তর ঝরে পড়া দুরন্ত বৃষ্টির ফোঁটায় যেন সে খুঁজে পাচ্ছে সম্মতি। কিন্তু সে তার চোখকে সেই অনুমতি দিতে নারাজ। তাকে কোথাও একটা পৌঁছতে হবে। তার গা-হাতের কেটে ও ছড়ে যাওয়া অংশগুলোতে লেগে থাকা তঞ্চিত রক্ত বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেতে থাকল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় তার মুখভঙ্গি বলে দেয় যে তার নিজেরই শরীর তার কাছে এখন কত বড় বোঝা ! সে কোন রকমে দাঁড়িয়ে পুনরায় হাঁটতে শুরু করল। অল্পদূর হেঁটে রাস্তার পাশেই একটা বাড়ির দরজায় কলিং বেল টিপল সে। ছাপা শাড়ি পড়া এক পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের মহিলা দরজা খুলে বললেন – “কিগো ছোট দিদিমণি ! এত দেরী হলো ! এমা তোমার ব্যাগ কোথায় ? মাথায় ছাতা দাওনি ? তোমার জামা ছিড়ল কি করে”? মেয়েটি কোন কথার উত্তর না দিয়ে বাড়িতে ঢুকল। তারপর সোজা বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। মহিলাটি বাথরুমের বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “ও ছোট দিদিমণি, কি হয়েছে ? কিছু বলছ না কেন”?

 

বাথরুমের ভিতর:

কলের তলায় একটি বালতি রাখা। কলের জল একটানা প্রচণ্ড শব্দ করে আছড়ে পড়ছে বালতিতে। শাওয়ারের তলায় মেয়েটি বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

 

মহিলাটি নিজের মোবাইল থেকে একটা কল্ করলেন – “বড় দিদিমণি, ছোট দিদিমণি এইমাত্র বাড়ি এল। আপনাকে কল্ করেছিল ? করেনি”? মহিলাটির চোখে-মুখে এখন আতঙ্কের এক ছাপ প্রতিফলিত হলো – “বড় দিদিমণি, ছোট দিদিমণির সাথে কোন ব্যাগ নেই ! মাথায় ছাতাও ছিল না ! মনে হচ্ছে পুরো রাস্তা ভিজতে ভিজতে এসেছে ! হ্যাঁ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। কিন্তু কোন কথার উত্তর না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল ! আমার কিন্তু কিছু ভালো ঠেকছে না ! হ্যাঁ তাড়াতাড়ি আসুন”।

 

বাথরুমের ভিতর:

একটা ওয়াশবেসিনের উপর, দেওয়ালে মাউন্টেড্ একটা আয়নার সামনে মেয়েটি বেআব্রু শরীরে দাঁড়িয়ে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে সে নিজেকে দেখছে। তার দেহ পাথরের মত নিশ্চল। তার দুচোখ এখন শুকনো, মুখমণ্ডল অভিব্যক্তিহীন।

 

পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছরের আরেক মহিলা বাথরুমের বন্ধ দরজায় আঘাত করা শুরু করলেন – “বাবুনি কি হয়েছে বল্ আমায়”। অপর মহিলাটি কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন – “বড় দিদিমণি, ছোট দিদিমণির জামা-কাপড় ছেঁড়া ছিল”! সেই কথা শুনে পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছরেরে মহিলাটি আৎকে উঠলেন – “কি বলছ কি তুমি”! তারপর তিনি আরও জোরে বাথরুমের বন্ধ দরজায় আঘাত করতে লাগলেন – “মা কি হয়েছে বল্ আমায়”, তাঁর ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল, দুচোখ ফেটে জল এল – “তুই আমায় বলবি না মা ! আমি আমার শরীরে তোকে ধারণ করেছি। তোর মনের দুঃখের ভাগ আমায় দিবি না ! মায়ের কাছে কোন লজ্জা নেই মা ! আমরা যন্ত্রণা একসাথে ভাগ করে নেব ! তুই আমার রক্ত”!

 

 

বাথরুমের ভিতর:

মেয়েটির দুই পা বেয়ে রক্তের ধারা নেমে আসছে ! মেয়েটি বাঁ হাতে তার নিম্নদেহ স্পর্শ করে সেই রক্ত মাখানো হাতের তালু নিষ্পলক দৃষ্টিতে দেখল, সেই রক্ত দেখে তার পুরো শরীর কাঁপতে শুরু করল। তার দুচোখ পুনরায় আর্দ্র হয়ে উঠল আর তার দৃষ্টি ঠেলে উঠে এল প্রতিহিংসা ! তারপরই এক তারস্বরে চিৎকার!

  

 

পঁচিশ বছর পর…………………………………………………………

 

“……………..পৃথিবীর ৯১.৬ শতাংশ ধর্ষণ বা ধর্ষণের প্রচেষ্টা পুলিশে রিপোর্ট-ই করা হয় না। অবশিষ্ট ৮.৪ শতাংশের পরিসংখ্যানটা বছরে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী। ইতিহাস প্রমাণ, বর্বরতায় পুরুষ চিরকালই নারীকে হার মানিয়েছে। ধর্ষণও এর ব্যতিক্রম নয়। শুধু ভারতবর্ষেই গড়ে প্রতিদিন তিরানব্বই জন মেয়ে ও মহিলা ধর্ষিতা হন। বাংলার প্রায় পঞ্চান্ন শতাংশ পরিবারে মহিলারা শুধু সংসারে শান্তি বজায় রাখার জন্য দিনের পর দিন  তাঁদের স্বামীর পাশবিক ক্ষিদের জাঁতাকলে নিজের ইচ্ছাকে পিষ্ট করেন। এই ‘স্বামী’-দের কি নাম দেওয়া যায় – ‘লাইসেন্স্ড রেপিস্ট’? সকল মায়েরই জঠরে ভ্রূণের জন্ম হয় এক নারী হিসাবে। এরপর জঠরে সেই ভ্রূণ প্রতিপালিত হওয়ার সময় হঠাৎ পুরুষত্ব এসে উপস্থিত হলে নারীত্ব তাকে নিজের স্থান ছেড়ে দেয়। উড়ে এসে জুড়ে বসা এই পুরুষত্ব যদি সনাতন নারীত্বকে মর্যাদা দিতে না শেখে তবে………………”

দুই হাতের দৃঢ় আঙুলগুলো ল্যাপটপের কী-বোর্ডের উপর ছুটে চলেছে। গোলাপী রঙে পলিশ্ড শেপ্ করা বড় বড় নখ সমন্বিত বাম হাতের আঙুলগুলো খুব ফ্যাশনেবল্, খুব আকর্ষণীয়; কিন্তু ডান হাতের আঙুলগুলোর কোন চালচুলো নেই, তারা খুব সাধারণ। ল্যাপটপের স্ক্রীনে আরও টাইপ হয়ে চলল – “নারীণাং ভূষণং লজ্জা, কিন্তু লজ্জা কি ? আমার তো মনে হয় যে, কখন ও কতটা নির্লজ্জ হওয়া যায় তার সঠিক জ্ঞান থাকার নামই লজ্জা; কিন্তু কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক তা ঠিক করে দেবে কে ? সমাজ ? সে তো মানুষের সমষ্টি। যত মানুষ তত রকম মানসিকতা। যদি অধিকাংশ মানুষই কোন বিষয়কে বেঠিক বলেন, তাহলেই কি তা বেঠিক হয়ে যায় ? রয়্যাল সোসাইটি-র সভাগৃহে দাঁড়িয়ে একটি জ্বলন্ত মোমবাতিকে দেখিয়ে প্রবল আবেগপ্রবণ হয়ে বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে যখন বলেছিলেন যে সেই জ্বলন্ত মোমবাতি থেকে নির্গত আলোও তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, তখন সভাগৃহে উপবিষ্ট সকল নরনারী একসাথে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলেন। কিন্তু আজ এর বিপরীত কথা বললে তাকে হাসির পাত্র হতে হবে। অর্থাৎ সঠিক, বেঠিক, ভালো, খারাপ, বা ঔচিত্যের সংজ্ঞা স্থান, কাল, বা পাত্র বদলানোর সাথে সাথে গিরগিটির মত রঙ বদলায়। মহাভারতে দুর্যোধন দ্রৌপদীকে তাঁর জঙ্ঘায় বসতে বলেছিলেন বলে দ্রৌপদী ভীষণ অপমান বোধ করেছিলেন। কিন্তু দ্রৌপদী অর্জুণের জঙ্ঘায় কি কোনদিন বসেননি – তখন তা নিতান্তই রোম্যান্স। আমি আমার শরীরের কোন্ অংশটা অনাবৃত রাখব ও কতটা অনাবৃত রাখব তা কি আমার ব্যক্তিগত পছন্দ নয় ? দর্শকের কাছে যা অত্যন্ত বেশী, আমার কাছে তা নিতান্তই অল্প হতে পারে। তাছাড়া চোখ তো দর্শকের নিজস্ব। দর্শক যদি আমাকে নির্লজ্জ দেখতে পছন্দ করেন, দেখবেন; আর যদি তিনি মনে করেন যে আমাকে লজ্জাবতী লতা হিসাবেই বেশী ভালো মানায়, চোখ সরিয়ে নেবেন। অপরের ক্ষতি করে না এমন ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিকে মান্যতা দিতে না পারলেও সে ব্যাপারে উদাসীন থাকাই যায়, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। বাস্তবে সমালোচনা হয়। ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি যতই অহিংস হোক, তাকে আহত হতেই হয়। আর কিছু আঘাত নিতান্তই ধৃষ্টতা কারণ আমি নিজেকে যতটুকু উন্মুক্ত করতে ইচ্ছুক, কিছু অসংযমী মস্তিষ্কের কৌতুহল তার চেয়ে অনেক বেশী”

ল্যাপটপের পাশে রাখা স্মার্টফোনে হঠাৎ একটা কল্ এল, স্মার্টফোনের টাচ্স্ক্রীনে ভেসে ওঠা নামটা “অভীক”। কল্ রিসিভ্ করার পর ফোনের ঐপাশ থেকে কিছুটা কৌতুক মেশানো স্বরে কথা শোনা গেল – “ভাবছ নিশ্চয়ই যে সকাল সকাল আবার বিরক্ত করছে। বাই দ্য ওয়ে, আমার প্রস্তাবটা নিয়ে কিছু ভাবলে”? ফোনের এইপাশ থেকে বেশ গম্ভীর কন্ঠে উত্তর গেল – “তুমি আমার উত্তর জানো অভীক। আমি তোমাকে আর মাকে কেন জানি না বোঝাতে পারি না যে একটা মেয়ের জীবনে স্বামী পরিচয়ের কোন পুরুষ থাকাটা আবশ্যিক নয়”…………………”না, না, শেষবারের মত বলছি অভীক, আমার সিঙ্গল মাদারহুড্ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলবে না। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে সেক্ষেত্রে আমাদের বন্ধুত্বটুকুও তোমাকে হারাতে হবে। জীবনটা আমার, তাই সেই জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো আমারই হবে। বাবুকে অ্যাডপ্ট করার সিদ্ধান্ত আমার ছিল, আর কোনদিন বিয়ে করব কিনা সেই সিদ্ধান্তটাও আমিই নেব। যাই হোক্, আমার বস্ কল্ করছেন, আমি তোমার সাথে পরে কথা বলছি”।

দ্বিতীয় কলটা রিসিভ্ করার পর ফোনের এপাশ থেকে বেশ নরম স্বরে কথা গেল – “হ্যাঁ দিদি বলুন”। ফোনের ঐপাশ থেকে কথা শোনা গেল – “তনুশ্রী, আর্টিকল্-টার আপডেট্ কি ? আমাদের ‘ললনা’ ম্যাগাজিনের পরের মাসের ইস্যু-র বেঙ্গলি ভার্শানে ঐটাই কিন্তু কভার আর্টিকল্ হবে”। তনুশ্রী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিলেন – “দিদি আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি নিউ জয়নি হওয়া সত্ত্বেও আপনি আমাকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, আমি আপনাকে নিরাশ করব না। আর আজকেই আমার লেখা শেষ হয়ে যাবে”। ফোনের ঐপাশ থেকে প্রত্যুত্তর এল – “গ্রেইট। আর আজ বিকেলের মিটিঙ-টা খেয়াল আছে তো ? ‘ললনা হেল্থ’, ‘ললনা গারমেন্টস্’, ‘ললনা ফুটওয়্যার’, ’ললনা লেন্স্টাইল’  – সব সেক্টরের গ্লোবাল হেড ভিডিও কন্ফারেন্সে থাকবেন। এমনকি মিস্ মর্যাদা চ্যাটার্জীও থাকবেন”। তনুশ্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “মিস্ চ্যাটার্জী থাকবেন”? মহিলা কন্ঠটি বললেন – “আরে এটা ‘ললনা গ্রুপ অফ ইনডাস্ট্রিস’ এর গ্লোবাল মিটিঙ। ওউনার থাকবেন না তা কখনও হয়? ঠিক সময়ে অফিসে চলে এসো কিন্তু”। তনুশ্রী নম্র ও অনুগত স্বরে উত্তর দিলেন –“হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে দিদি”। ফোনটা রাখার সাথে সাথে পাশের ঘর থেকে একটা বাচ্চা ছেলের কান্না মাখানো কন্ঠস্বর শোনা গেল – “না, আমি মায়ের হাতে খাবো”! তনুশ্রী দুই হাতে তাঁর লম্বা চুলের গোছায় একটা খোঁপা বেঁধে তাতে ক্ল ক্লিপ লাগাতে লাগাতে প্রলম্বিত স্বরে বললেন – “মা, বাবুকে আমি খাওয়াচ্ছি। তুমি দুপুরের রান্নাটা শুরু করে দাও। আমি বাবুকে খাইয়ে যাচ্ছি”।

 

কনফারেন্স রুম, ললনা ম্যাগাজিন অফিস, কলকাতা:

‘ললনা গ্রুপ অফ ইনডাস্ট্রিস’-র সব সেক্টরের প্রতিনিধিরা একে একে বিজনেস্ আপডেট দিলেন। ‘হোম অ্যাপ্লায়েন্স’ সেক্টরের গ্লোবাল হেড আগের কোয়ার্টার-র রেভিনিউ আপডেট দেওয়া শেষ করলে কানাডা প্রবাসী মিস্ মর্যাদা চ্যাটার্জী ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য রাখলেন – “থ্যাঙ্কস্ টু রেবেকা, সুনীথা, এলিশিয়া, আফ্রা, অ্যানা, অ্যান্ড লাবণ্য ফর অল দ্য বিজনেস্ অ্যান্ড রেভিনিউ আপডেট্স। আই উড্ লাইক্ টু থ্যাঙ্ক অল্ অফ্ ইউ ফর ইয়োর কন্টিনিউড্ সাপোর্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন্ ফর ‘ললনা গ্রুপ’। প্লিস্ পাস্ মাই ওয়ার্ডস্ অফ্ গ্র্যাটিচিউড্ টু অল দ্য এম্প্লইস্। ইউ অল নো আওয়ার আনাদার আজেন্ডা অফ টুডেইস্ মিটিঙ। ‘ললনা গ্রুপ’ হ্যাস্ ডিসাইডেড্ টু লঞ্চ আ নিউ বিজনেস্ সেক্টর – ‘ললনা কসমেটিক্স, স্কিন অ্যান্ড হেয়ার কেয়ার’। আই উড্ লাইক্ টু রিকোয়েস্ট ওয়ান অফ্ দ্য উড্বি ডিরেক্টরস্ অফ্ ‘ললনা কসমেটিক্স, স্কিন অ্যান্ড হেয়ার কেয়ার’, মিসেস্ রাধিকা জেইসওয়াল টু শেড্ লাইট্ অন্ দ্য ডিটেইল্স”। এরপর মিসেস্ রাধিকা জেইসওয়াল বলা শুরু করলেন – “থ্যাঙ্কস্ মিস্ মারয়াদা চ্যাটার্জী অ্যান্ড ‘ললনা গ্রুপ অফ ইনডাস্ট্রিস’ ফর গিভিং মি দি প্রেশাস্ অপরচুনিটি টু সার্ভ ফর ‘ললনা গ্রুপ অফ ইনডাস্ট্রিস’ অ্যাস্ আ ডিরেক্টর অফ্ ‘কসমেটিক্স, স্কিন অ্যান্ড হেয়ার কেয়ার’ সেক্টর………………………………………….”

 

একটি ল্যাবরেট্রি:

গায়ে সাদা ল্যাব কোট, হাতে সাদা দস্তানা, ও চোখে স্বচ্ছ ল্যাব স্পেকট্যাকেল্স পরা একজন পুরুষ একটি ঘরের বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজায় লাগানো রেটিনা স্ক্যানারে একটি সবুজ আলো জ্বলে উঠল ও দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল। ঐ ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করলে দরজাটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের মধ্যে একটি বেশ বড় টেবিলের চারধারে দাঁড়িয়ে একই রকম সজ্জায় একদল নর-নারী কাজ করছিলেন। প্রবিষ্ট ব্যক্তিটিও তাঁদের সাথে যোগ দিলেন। টেবিলটির উপর রাখা কটি স্বচ্ছ জারে কিছু মৃত মাকড়সা সংরক্ষিত আছে। একটি জারের গায়ে লাগানো লেবেলে লেখা আছে – ‘সাউদার্ন ব্ল্যাক উইডো’। বাকি জারগুলির লেবেলগুলিতে লেখা আছে – ‘ওয়েস্টার্ন ব্ল্যাক উইডো’, ‘নরদার্ন ব্ল্যাক উইডো’। এছাড়াও একটি স্বচ্ছ জারে সংরক্ষিত রয়েছে একটি পঙ্গপালের মত দেখতে পতঙ্গের মৃতদেহ। এই জারের লেবেলে লেখা রয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক নাম – ‘টেনোডেরা সাইনেনসিস্’। টেবিলটি থেকে কিছু দূরে দেওয়ালে ঝোলানো একটি বড় কম্পিউটার-মনিটারে ফুটে উঠেছে মস্তিষ্কের একটি বিবর্ধিত ডিজিটাল ছবি, তার নীচে ক্যাপ্শন হিসাবে লেখা আছে – “চাইনিজ্ ম্যান্টিস্”। কর্মরত ঐ নর-নারী একে অপরের সাথে আলোচনা করছেন ও সেই আলোচনার ভিত্তিতে নিজের নিজের কাজ করে চলেছেন।

 

পাঁচ বছর পর………………………………………………

 

তনুশ্রী অফিসের লেডিস্-ওয়াশরুমের ভিতরে দেওয়ালে মাউন্টেড্ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে তাঁর দুই ঠোঁটে ওয়াইন্ রেড্ লিপস্টিকের রঙ গাঢ় করে নিল। লিপস্টিক টিউবে ইংরাজী হরফে লেখা রয়েছে – “ললনা”। তাঁর ফোনে একটা রিং হলো। ডান হাতেই লিপস্টিক টিউবটা ধরে রেখে আয়নার পাশেই তাকে রাখা খোলা হ্যান্ডব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে তনুশ্রী বাম কানে দিলেন ও বললেন – “হ্যাঁ দাদা এসে গেছেন ? এই দু মিনিটে আমি আসছি”। কল-টা শেষ করে একটু তাড়াহুড়োয় তনুশ্রী লিপস্টিক টিউবের মুখ বন্ধ করে ফোনটা আর লিপস্টিক টিউব-টা হ্যান্ডব্যাগে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ‘ললনা ম্যাগাজিন’-র অফিস থেকে বেরোনোর সময় তনুশ্রী দেখলেন যে একটি অ্যাপ-ক্যাব অফিসের গেটের ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। তনুশ্রী দ্রুত পদক্ষেপে তাঁর হাই হিল-র একটানা ক্লিক্-ক্ল্যাক্ শব্দে অফিস ক্যাম্পাস পেরিয়ে যখন ক্যাব-টার বেশ কিছুটা কাছে এসে পৌঁছেছেন, ক্যাবের নাম্বার দেখে বুঝলেন যে ক্যাবটা তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছে। কিন্তু ক্যাবের স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকা ড্রাইভারের দৃষ্টি তাঁর যেন খুব একটা ভালো লাগল না। তনুশ্রী বুঝতে পারলেন যে লোকটা একভাবে তাঁর পেন্সিল স্কার্টের নিম্নে পায়ের অনাবৃত অংশের দিকে তাকিয়ে আছে। তনুশ্রী ক্যাবের কাছে গিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে ও.টি.পি. বললে লোকটা যেন হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে একটু তাড়াহুড়ো করে ও.টি.পি.-টা এন্টার করল। ক্যাব চলাকালীন সন্দেহের বশে বেশ কয়েকবার তনুশ্রী গাড়ির ভিতরে থাকা রিয়ার ভিউ মিরার্ এর দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে লোকটাও বার বার রিয়ার ভিউ মিরার্-এ তাঁকে দেখার চেষ্টা করছে। তনুশ্রী তাকালেই সে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা। যথেষ্ট সতর্ক থাকার চেষ্টা করলেও সারাদিন পরিশ্রমের পর ক্লান্তিতে তনুশ্রীর চোখদুটো অল্পক্ষণের জন্য লেগে এসেছিল। ঘুম ভাঙার পর তনুশ্রী যখন বুঝতে পারলেন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, তিনি ভীষণ টেন্স হয় পড়লেন ! এরপর হঠাৎ ক্যাবের দুপাশে বন্ধ দরজার কাচের মধ্য দিয়ে বাইরের দিকে একবার তাকিয়ে তনুশ্রীর যেন ঠাওর হতে লাগল যে এই নির্জন রাস্তা তাঁর চেনা নয় ! তনুশ্রী বেশ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে বললেন – “দাদা এটা কোন্ রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ! আপনি তো ম্যাপ্ ফলো করছেন না”! লোকটা কোন উত্তর দিল না। তনুশ্রী আতঙ্কিত হয়ে ফোনের টাচস্ক্রীনের লক-এ পাসওয়ার্ড দিলেন – এক ভীষণ বিপদের আশঙ্কায় তনুশ্রীর হাত-পা কাঁপছে – নাঃ লক্ খুলল না, পাসওয়ার্ড ভুল দেওয়া হচ্ছে, ক্যাবে এ.সি. চলা সত্ত্বেও তনুশ্রীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় লক্ খুলে তনুশ্রী যেই অ্যাপ-র ‘প্যানিক বাটন্’ টিপতে যাবেন, সামনে ড্রাইভারের সিট্ থেকে লোকটা আংশিকভাবে পিছন ঘুরে বাঁ হাতে তনুশ্রীর হাত থেকে ফোনটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিল ! তনুশ্রী দরজার কাচ নামিয়ে তারস্বরে চিৎকার করলেন “হেল্প”! কোন লাভ হলো না। সেই রাস্তা দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নির্জন ! এবার চলন্ত অবস্থাতেই সর্বশক্তি দিয়ে গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করলেন তনুশ্রী। নাঃ দুপাশের দুটো দরজাই সেন্ট্রালি লক্ করে রাখা হয়েছে। এখন তনুশ্রী পিছনের সিট থেকেই লোকটাকে দুই হাতে আঘাত করা শুরু করলেন। শুরু হলো ধস্তাধস্তি আর ক্যাবটা গিয়ে রাস্তার পাশে একটা মোটা গাছে গিয়ে ধাক্কা দিল। উভয়ই আঘাত পেলেন। তারপর লোকটা বন্ধ গাড়িতেই সামনের সিট্ থেকে পিছনের সিটে আসার চেষ্টা করল। তনুশ্রী সর্বশক্তি প্রয়োগ করে লোকটাকে দূরে ঠেলার চেষ্টা করতে লাগলেন – “খর্বদার কাছে আসার চেষ্টা করবি না বাস্টার্ড”! লোকটা তনুশ্রীকে বাগে আনার জন্য তাঁর পেটে সজোরে একটা ঘুষি মারল। তনুশ্রীর আর্ত চিৎকার বন্ধ গাড়ির মধ্যেই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তারপর লোকটা তনুশ্রীর মাথায় বেকায়দায় আঘাত করায় তনুশ্রী জ্ঞান হারালো। লোকটা এরপর সামনের সিট থেকে পিছনের সিট-এ এল এবং হাঁপাতে হাঁপাতে বেশ অনেকক্ষণ ধরে তনুশ্রীকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে দেখল আর তারপর……………………………………………………

 

পরের দিন সকাল, বটতলা পুলিশ স্টেশন, কলকাতা:

একটি কেবিনে চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের একজন বেশ সুঠাম উর্দি পরা ভদ্রলোক চেয়ারে বসে দুহাতে মুখের সামনে খবরের কাগজ ধরে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে একটি খবর পড়ছেন। ওনার সামনে টেবিলে রাখা পরিচয় ফলকে লেখা আছে – “পোলিস ইন্সপেক্টর স্মার্ত গুপ্ত”। আরেকজন উর্দি পরা ব্যক্তি কেবিন-র অর্ধেক খোলা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “স্যার আসব”? কেবিন-র মধ্যে উপবিষ্ট ভদ্রলোক খবরের কাগজের পাতা থেকে চোখ না সরিয়েই সম্মতি জানালেন – “হুম্”। তখন ব্যক্তিটি কেবিনে প্রবেশ করে দাঁড়ালেন ও বললেন – “স্যার, ভাঙা কালি মন্দিরের কাছে একটা গাড়িতে একটা নেকেড্ ডেড্ বডি পাওয়া গেছে”। এই কথা শুনে স্মার্ত তাঁর দুহাতে ধরা খবরের কাগজটা কিঞ্চিৎ নামালেন ও  দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে দুই ভ্রু উঁচিয়ে বললেন – “রেপ কেস্”! দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি বললেন – “বডি-টা একজন পুরুষের। বডি-র অবস্থা ভালো নয় স্যার”। স্মার্ত একইরকমভাবে খবরের কাগজটাকে ধরে রেখে এবার ভ্রু কুঁচকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “কেন”? দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি উত্তর দিলেন – “বডি-র বেশ কিছু অংশ থেকে মাংস খুবলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পুরো বডি-তে প্রচুর ছোট-বড়  ক্ষত”। স্মার্ত এতক্ষণ ধরে খবরের কাগজে যে খবরটা পড়ছিলেন সেই খবরের পাতাটা সামনে টেবিলের উপর রাখলেন। দন্ডায়মান ব্যক্তিটির চোখ গেল খবরের শিরোনামে – “মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ও দিল্লীতে ক্ষত-বিক্ষত যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার”। স্মার্ত অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে বললেন – “এসব কি হচ্ছে ! যাই হোক্, বডি-টা ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করো আর ভিক্টিমের গত তিন মাসের কল ডিটেইল্স আমার চাই”। স্মার্ত কথা শেষ করতে না করতেই তাঁর ফোনে একটা কল্ এল, স্মার্ত কানে ফোনটা নিয়ে কন্ঠস্বরে একটা পোশাকী ভদ্রতা রেখে বললেন – “হ্যাঁ ডঃ রয়, এই আপনার কথাই ভাবছিলাম। আপনার কাছে ফরেন্সিক-টেস্ট এর জন্য একটা বডি যাচ্ছে……………..”।

ফরেন্সিক ল্যাবের একটি ঘরে একজন মাঝবয়সী ব্যক্তি একটি মৃতদেহের সারা গায়ের ক্ষতগুলো ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। স্মার্ত ঘরে প্রবেশ করে ব্যক্তিটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কি ডক্টর রয়”? ডক্টর রয় কাজ করতে করতেই চিন্তিত ও ধীর-স্থির স্বরে উত্তর দিলেন – “একটু অপেক্ষা করুন গুপ্ত বাবু। বলছি, সঅব বলছি”। ঘরে কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে রীতিমত হতভম্ব হয়ে ডক্টর রয় বলে উঠলেন – “বাপের জন্মে এমন কেস হ্যান্ডেল করিনি ! ভিক্টিমের ঘাড়ের বাঁ আর ডান দিকে এই গভীর ক্ষতদুটো দেখতে পাচ্ছেন ? ঘাড়ের লেফ্ট আর রাইট্ ক্যারোটিড্ আর্টারি বিচ্ছিরিভাবে ড্যামেজ্ড হয়েছে। কাল সারা রাত ব্লিডিং হওয়ায় ভিক্টিম্ মারা গেছে”। স্মার্ত জিজ্ঞাসা করলেন – “ওয়েপন্”? ডঃ রয় আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন – “দাঁত”। স্মার্ত অবাক হলেন – “দাঁত ! কিন্তু এখানে জন্তু-জানোয়ার কোত্থেকে আসবে”? ডঃ রয় এখন বিজ্ঞের মত ভারী গলায় বললেন – “মানুষ গুপ্ত বাবু, মানুষ। আমি হান্ড্রেড অ্যান্ড টেন্ পার্সেন্ট শিয়র্ এটা মানুষেরই কম্ম”। স্মার্তের গলার স্বরে সন্দেহের ছোঁয়া – “কিন্তু……” আর সেই সন্দেহের নিরসন ঘটিয়ে ডঃ রয় বললেন – “মানুষের দাঁত বা নখের দ্বারা এইসব গভীর ক্ষত হওয়া সম্ভব গুপ্ত বাবু তবে তার জন্য সেই মানুষকে যে প্রচণ্ড ফোর্স দিতে হবে তা সুস্থ-স্বাভাবিক মস্তিষ্কে অসম্ভব”। ডঃ রয়-র কিছু যেন একটা মনে পড়ল – “ও হ্যাঁ, আপনাকে তো একটা কথা বলাই হয়নি”। স্মার্ত ভীষণ জিজ্ঞাসু অভিব্যক্তি নিয়ে বললেন – “কি বলুনতো”? ডঃ রয় বললেন – “আমি সন্দেহ করছি যে মার্ডারার্ একজন মহিলা”। ডঃ রয় গ্লাভ্স হাতে পাশের টেবিলে রাখা একটা সিল্ করা ট্রান্সপারেন্ট এভিডেন্স-পাউচ্ নিয়ে স্মার্ত-র মুখের সামনে ধরলেন। পাউচ্-র ভিতরে ছিল দুটো ভাঙা নখের টুকরো। স্মার্ত দেখে বুঝতে পারলেন যে পলিশ্ করা নখগুলোকে খুব সুন্দর শেপ্ দেওয়াও হয়েছিল। হঠাৎ স্মার্তের ফোনটা বেজে উঠল। স্মার্ত কল্ রিসিভ্ করে বললেন – “বলো”। ফোনের ঐপাশ থেকে কথা এল – “স্যার, আপনার কথামত ভিক্টিমের গত তিন মাসের কল্ ডিটেইল্স বার করিয়েছি। ভিক্টিম একজন অ্যাপ-ক্যাব ড্রাইভার। ভিক্টিম শেষ যে নাম্বারে কল্ করেছিল, সেটা ‘তনুশ্রী মজুমদার’ নামে রেজিস্টার্ড”। স্মার্ত ফোনে ভারী গলায় বলে উঠলেন – “আচ্ছা, মহিলা”।

 

কয়েক মাস পর……………………………………

 

সেদিন পুলিশ স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরে স্মার্ত ড্রইং রুমে বসে টিভিতে খবর দেখছিলেন – “ভারতের পাশাপাশি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বেলজিয়াম, আর চীনেও পরপর বেশ কটি পুরুষ হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে; তবে নাবালক হত্যার বিচারে ভারত বাকি দেশগুলির থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে। পুলিশি তদন্ত বলছে যে এই সকল নৃশংস হত্যাকান্ডের মূলে আছে ধর্ষণ বা ধর্ষণের প্রচেষ্টা…………………………” – স্মার্তের স্মৃতিতে ভেসে উঠল এক মহিলার হিংস্র ও উত্তেজিত মুখ। কিছুদিন আগেই বাড়ি ফেরার পথে স্মার্ত সিগারেট কেনার জন্য রাস্তার এক ধারে বাইকটা যখন রাখছিলেন, দেখলেন যে রাস্তার বিপরীত ধারে এক পাগল মহিলা কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে বসে আছেন আর রাস্তা দিয়ে যে পুরুষই হেঁটে যাচ্ছেন তাঁকে গালাগাল করছেন – “সব শালা কুকুরের মত মরবি ! আমায় পাগলি বলে হেয় করিস ! আমাকেও তো ছাড়লি না”! রাস্তার সেই পাগল মহিলার উস্খো-খুস্খো চুল, তাঁর ছেঁড়া-ফাটা শাড়ি-ব্লাউজ, আর আর্দ্র চোখে মুখের হিংস্র অভিব্যক্তি মনে করে স্মার্ত বেশ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। তিনি অস্বস্তি কাটানোর জন্য তৎক্ষণাৎ রিমোট দিয়ে টিভি-র চ্যানেল পরিবর্তন করতে শুরু করলেন এবং অনেক চ্যানেল পরিবর্তন করার পর হঠাৎ “স্ট্রেঞ্জ ওয়ার্ল্ড” চ্যানেলে এসে চম্কে গেলেন, তাঁর আর অন্য কোন চ্যানেলে যাওয়া হলো না। চ্যানেলটিতে যে ডকিউমেন্ট্রি ফিল্ম সম্প্রচারিত হচ্ছিল তার বিষয় – “সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম্” – বেশ কয়েক প্রকার মাকড়সা ও পতঙ্গদের মধ্যে দেখা যায় যে, অনিচ্ছুক স্ত্রী জীবটিকে পুরুষটি সঙ্গমে বাধ্য করলে পুরুষটিকে স্ত্রী জীবটির হিংস্রতার শিকার হতে হয়। কখনও কখনও সঙ্গমের আগেই বা সঙ্গমের সময় বা কখনও সঙ্গমের ঠিক পরে পুরুষটি স্ত্রী জীবটির খাদ্যে পরিগণিত হয়।

সন্ধ্যেটা স্মার্তের খুব অস্বস্তিতে কাটলেও রাত্রিটা খুব সুন্দর ছিল কারণ স্মার্তের স্ত্রী স্মৃতিকণা সেদিন রাতে খুব রোম্যান্টিক মুডে ছিলেন। এমনিতে স্মার্ত স্মৃতিকণার যেচে কাছে আসাটা ভীষণই উপভোগ করেন কারণ এমন রাত কমই আসে। সেই রাতগুলো তাঁদের শোবার ঘরে অনেক রাত পর্যন্ত আলো জ্বলে। অধিকাংশ প্রেম তো দৃষ্টিতেই শুরু, তাই আলো ছাড়া কিই বা প্রেম-আস্বাদন ? অবশ্য প্রেম আর পাশবিকতা – মানুষের এই দুই আদিম ভাবনার পার্থক্যটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ পার্থক্যটা বুঝলেও সময় বিশেষে সেই বোধ হারিয়ে ফেলেন। রাতে শুয়ে স্মৃতিকণা যখন তাঁর কোঁকড়ানো চুলের গোছা একপাশে করে স্মার্তের চওড়া অনাবৃত বুকে লাভ্ বাইট্ দিচ্ছিলেন, সেই যন্ত্রণা-আনন্দের যুগলবন্দীতে স্মার্ত নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। এরপর একটা মুহূর্তে প্রচন্ড ব্যাকুল হয়ে স্মার্ত যখন স্মৃতিকণাকে এক ঝটকায় কাছে টেনে নিয়ে তাঁর চোখে চোখ রাখলেন, স্মার্তের সমস্ত শরীর তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। স্মৃতিকণা এখন স্মার্তের দুচোখের দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু মিষ্টি হাসি হেসে স্মার্তকে নিজের বুকের দিকে তাকাতে ইশারা করলেন। কিন্তু নিজের বুক ও পেটের দিকে তাকিয়ে স্মার্তের গা-হাত-পা মুহূর্তের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে গেল – তিনি দেখলেন যে তার সমস্ত বুক ও পেট রক্তাক্ত ! তিনি আতঙ্কে খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠে বসলেন – “না”! তখন তাঁর ধারণা হলো যে তাঁর চারপাশ অন্ধকার আর বোধহয় এতক্ষণ তিনি রাতে শোবার ঘরে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি তাড়াহুড়ো করে হাতড়ে খাটের ডান পাশে টেবিলের উপর রাখা ডিম লাইটটা জ্বালিয়ে তাঁর বাঁ পাশে দেখলেন – দেখলেন যে স্মৃতিকণা পিছন ফিরে শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। এই দেখে স্মার্ত একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। ডিম লাইটের পাশে রাখা ফোনে একটা মেসেজ্ এল। স্মার্ত ফোনে দেখলেন যে ডঃ রয় ইংরাজী হরফে মেসেজ্ করেছেন – “পেয়ে গেছি”!  স্মার্ত মেসেজের উত্তর দিতে দিতে দরজা খুলে ব্যালকনিতে গেলেন – “কি পেলেন ? চাইলে এখনই বলতে পারেন”। ব্যালকনির জমাট বাঁধা অন্ধকার চিড়ে স্মার্তের স্মার্টফোন জ্বলে উঠল। স্মার্ত কানে ফোনটা নিয়ে বললেন – “বলুন ডক্টর রয়”। ফোনের ঐপাশ থেকে ডক্টর রয় গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বললেন – “গত কয়েক মাসে আপনার পাঠানো ক্ষত-বিক্ষত খোবলানো মেল বডিগুলোর মধ্যে যেগুলোতে প্রসাধনী বা কসমেটিক্সের ট্রেস পেয়েছি, সেগুলো পরীক্ষা করে আমি একটা কমোন বিষয় খুঁজে পেয়েছি – যেমন ধরুন লিপস্টিকের দাগ বা ভাঙা পলিশ্ড নখ বা মহিলাদের লম্বা চুল, এসবের মধ্যেই আমি এক বিশেষ প্রকার প্যারাসাইট বা পরজীবীর উপস্থিতি লক্ষ্য করছি। এই প্যারাসাইট অনেকটাই টক্সোপ্লাজমা গন্ডিআই প্যারাসাইটের মত। আমার তো মনে হয় এই প্যারাসাইট আসলে জেনেটিকালি মডিফায়েড্ টক্সোপ্লাজমা গন্ডিআই”। স্মার্ত মুখে একটা বিরক্তি সূচক ভঙ্গি নিয়ে ফোনে বললেন – “এসবের সাথে প্যারাসাইটের কি সম্পর্ক থাকতে পারে”? ফোনের ঐপাশ থেকে অপেক্ষাকৃত ভারী কণ্ঠস্বরে ডক্টর রয় উত্তর দিলেন – “আছে স্মার্তবাবু সম্পর্ক আছে। কসমেটিক্সে ব্যবহৃত মেটিরিয়ালে এই পরজীবী মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে সহজেই এরা মেয়ে ও মহিলাদের দেহে প্রবেশ করতে পারে। আপনাকে সহজ করে বলি। এই পরজীবী মেয়ে তথা মহিলাদের মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটাচ্ছে যাকে একপ্রকার ‘এপিজেনেটিক রিমডেলিং’ বলা যেতে পারে। কোন মেয়ে বা মহিলাকে তাঁর ইচ্ছার বিরূদ্ধে সেক্সুয়ালি এক্সাইটেড্ করা হলে এই ‘এপিজেনেটিক রিমডেলিং’-র ফলস্বরূপ তাঁর মধ্যে এক হস্টাইল ক্যানিবালিস্টিক ইমপাল্স বা হিংস্র নরখাদক প্রবৃত্তি জন্ম নেয়, তখন সামনের মানুষটির আর রক্ষে নেই”! স্মার্ত একটা ছোট্ট ঢোক গিলে বললেন – “কি বলছেন কি মশাই”! ডঃ রয় বলে চললেন – “আমার থিয়োরি এই বলে যে, কেউ বা কারা সম্পূর্ণরূপে আড়ালে থেকে পৃথিবীর সমগ্র নারী সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত করতে চায় আর মে বা মহিলারা জানেনও না যে তাঁদের শরীরেই রয়েছে এই রক্ষা কবচ”। স্মার্ত বেশ রূঢ় স্বরে বললেন – “সে যেই হোক, আইনের চোখে সে অপরাধী। সারা পৃথিবী জুড়ে এত পুরুষ মরছে”। ডঃ রয় প্রত্যুত্তরে বেশ ভারী গলায় বলে উঠলেন – “উঁহু ; পুরুষ নয় স্মার্তবাবু , অসংযমী পুরুষ”। স্মার্ত কিছুটা অপ্রস্তুত স্বরে বললেন – “ঐ ঐ যাই হোক”। এখন স্মার্তের স্বরে অনুসন্ধিৎসা – “বাই দা ওয়ে ডক্টর, আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে যে আপনি অপরাধীর হয়ে কথা বলছেন”। ডঃ রয় গম্ভীর গলায় বললেন – “অপরাধীদের শাস্তি দিচ্ছে যে আমি তার হয়ে কথা বলছি স্মার্তবাবু। গত  দুবছরের রেপ স্ট্যাটিসটিক্স দেখেছেন ? আইন যে কাজে ব্যর্থ, ঐ একটা প্যারাসাইট তা করে দেখিয়েছে”। স্মার্ত একটু বিরক্ত হয়ে বললেন – “আরে মশাই আত্মরক্ষার অন্য পথও তো আছে। কত মেয়েই তো কারাটে শেখে”। ডঃ রয় প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে উঠলেন – “কারাটে ! স্মার্তবাবু আজ পর্যন্ত আপনার কারিয়ারে আপনি তো বেশ কয়েকটা গ্যাঙ রেপ কেস হ্যান্ডেল করেছেন। কেসগুলো স্টাডি করে আপনি কি বুঝেছেন ? যে ভয়ঙ্কর গ্যাঙ রেপগুলো হয়, আপনার মনে হয় যে কারাটে জানলেই একজন মেয়ে বা মহিলা নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবেন”? কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। ডঃ রয় এখন কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন – “আমি বিজ্ঞানের উপাসক। আমি বুদ্ধির আরাধনা করি। এই গোটা কর্মকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড যেই হোক, আমি তার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না। তবে আমি আইনের পৃষ্ঠপোষকও বটে। সেইজন্য আমি ঐ কসমেটিক্স কোন্ ব্র্যান্ডের তা বোঝার চেষ্টা করছি। আমার টিম পৃথিবীর সমস্ত নামি দামী ব্র্যান্ডের স্যাম্পেলের সাথে ম্যাচ্ করিয়ে দেখছে। আমি আপনাকে আপডেট্ জানাবো”। এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডঃ রয় বললেন – “যাক্, রাত বিরেতে অনেক বকলাম। ফোন রাখলাম স্মার্তবাবু”।

 

কয়েক সপ্তাহ পর…………………………………………

 

একদিন সকালে ডঃ রয় স্মার্তবাবুকে কল্ করলেন – “স্মার্তবাবু গুড্ মর্ণিং। একটা ব্র্যান্ডের স্যাম্পেলের কম্পোজিশন্ ম্যাচ্ করেছে”। স্মার্ত উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “বলুন মশাই তাড়াতাড়ি বলুন ! আমার এরিয়ায় অনেকগুলো মিস্হ্যাপ্ হয়ে গেছে ! মিডিয়া, প্রেস, বস্ – এত প্রেশার আমি আর নিতে পারছি না”! ডঃ রয় বললেন – “ ‘ললনা কসমেটিক্স, স্কিন অ্যান্ড হেয়ার কেয়ার’ – পার্ট অফ্ ‘ললনা গ্রুপ অফ্ ইন্ডাসট্রিস্’ ”। স্মার্ত হতভম্ব হয়ে বললেন – “ললনা গ্রুপ অফ্ ইন্ডাসট্রিস্……”, ডঃ রয় বললেন – “বুঝতে পারছেন তো, মাস্টারমাইন্ড-টা কে। মিস্ মর্যাদা চ্যাটার্জী”। “মর্যাদা চ্যাটার্জী” নামটা শোনার সাথে সাথেই স্মার্তের স্মৃতিপটে ভেসে উঠল প্রায় ত্রিশ বছর আগেকার কয়েকটা টুকরো ছবি – একটা বর্ষণমুখর পড়ন্ত বিকেল, পনেরো-ষোলো বছর বয়সী একটা মেয়ে, তার পরনে জিন্স আর টপ্, আর মেয়েটার উপর স্মার্তের করা পাশবিক অত্যাচার। হঠাৎ স্মৃতিকণা ঘরে প্রবেশ করে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে বসলেন, সাজতে সাজতে আয়নার দিকে তাকিয়েই স্মৃতিকণা স্মার্তের উদ্দেশ্যে বললেন – “আমি একটু বেরোচ্ছি বুঝলে”। স্মার্ত যে বিষয়ে কোনদিন মাথাই ঘামাননি তা আজ হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, আর তা দেখার সাথে সাথে স্মার্তের বুক রক্তশূন্য হয়ে গেল ! স্মৃতিকণার হাতে যে ফেস্ পাউডার কেস-টা ছিল তার উপর ইংরাজী হরফে লেখা ছিল – “ললনা”!

About Diganta Paul

জন্ম: ১৯৮৯ সালে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাওড়া জেলায়। শিক্ষা: প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা হাওড়া জিলা স্কুলে। এরপর কলকাতার "সেইন্ট থমাস্ কলেজ অফ এঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনলজি" কলেজ থেকে বৈদ্যুতিক কারিগরিবিদ্যা নিয়ে প্রযুক্তিতে স্নাতক (B.Tech. in Electrical Engineering)। পেশা: তথ্য প্রযুক্তি পেশাদার (IT Professional)। নেশা: বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা নিয়ে পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনা। এছাড়াও বিজ্ঞান প্রবন্ধ, বিজ্ঞান নিবন্ধ, কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প, গাণিতিক কল্পকাহিনী, বিজ্ঞান নাটক, ও বিজ্ঞান কবিতা লেখা। যোগাযোগ: digantapaul5@gmail.com

ফেসবুক কমেন্ট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।