আধুনিক রোবটিক্স ও এআই গবেষণার সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি হল: এমন এক সহকারী যন্ত্র, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে, নিজের ভুল নিজেই ধরতে পারে, আর মানুষের পাশে থেকে কাজ করতে পারে নীরবে ও নিরাপদভাবে।
অনেকেই জাপানের রোবট রেস্টুরেন্টের ভিডিও দেখেছেন। কেউ ট্রে হাতে খাবার নিয়ে যাচ্ছে, কেউ নির্দিষ্ট টেবিলে থেমে দাঁড়াচ্ছে, কেউ আবার মানুষের ডাকে সাড়া দিচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, রোবট বুঝি সবই পারে। কিন্তু ড. আলিমুর রেজা সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা টানেন—এসব উদাহরণে অনেক সময় রোবট পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নয়। কোথাও মানুষ নির্দেশ দিচ্ছে, কোথাও রোবটকে আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া পথে চালানো হচ্ছে, কোথাও আবার মানুষ-রোবট ইন্টারঅ্যাকশন (মানুষের সহায়তা বা হস্তক্ষেপ) অনিবার্য। অর্থাৎ রোবট কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু তার “বোঝার ক্ষমতা” ও “স্বাধীন সিদ্ধান্ত” এখনো সীমিত।
এই সীমাবদ্ধতা বুঝতে একটি সহজ তুলনা করা যায়। আপনি যদি নতুন কোনো ভবনে যান, প্রথমে হয়তো কাউকে জিজ্ঞেস করবেন কোথায় সিঁড়ি, কোথায় লিফট, কোথায় অফিস। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনি নিজে নিজে পরিবেশ বুঝে চলতে পারেন। মানুষের এই ক্ষমতা আসে দেখার অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, এবং সাধারণ বোধ থেকে। রোবটের কাছে এই সাধারণ বোধ স্বাভাবিকভাবে থাকে না। তাকে শিখিয়ে দিতে হয়—কোনটা রাস্তা, কোনটা বাধা, কোনটা মানুষ, কোনটা কাঁচের দরজা, কোনটা ছায়া। ঠিক এই শেখানোর প্রক্রিয়াই ড. আলিমুর রেজার গবেষণাক্ষেত্রের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
কমপ্লিটলি অটোনমাস এজেন্ট বলতে তাই শুধু “নিজে নিজে চলা” বোঝায় না। এর মানে হলো পরিবেশকে বুঝে চলা। রোবটকে যদি আপনার ঘরে কাজ করতে হয়, তাকে জানতে হবে কোথায় হাঁটা নিরাপদ, কোথায় পা পিছলাতে পারে, কোথায় শিশু খেলছে, কোথায় নরম কার্পেট আর কোথায় শক্ত মেঝে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন মানুষের জন্য সামান্য অস্বস্তি হতে পারে, রোবটের ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে বিপজ্জনক। তাই রোবটের স্বয়ংক্রিয়তার সঙ্গে নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
এই স্বয়ংক্রিয়তার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো কম্পিউটার ভিশন ও মেশিন লার্নিং। কম্পিউটার ভিশন মানে যন্ত্রকে ছবি বা ভিডিও দেখে বুঝতে শেখানো, আর মেশিন লার্নিং মানে ডেটা থেকে শিখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী সবসময় একই থাকে না। আলো বদলে যায়, ঘরে নতুন জিনিস ঢোকে, মানুষ দ্রুত নড়াচড়া করে, কখনো পোষা প্রাণী সামনে চলে আসে। একটি অটোনমাস এজেন্টকে এসব পরিবর্তনের মধ্যেও স্থিরভাবে কাজ করতে হবে। এখানেই গবেষকদের বড় চ্যালেঞ্জ: কীভাবে যন্ত্রকে এমনভাবে শেখানো যায় যাতে সে কেবল পরিচিত পরিবেশে নয়, অপরিচিত পরিবেশেও মানিয়ে নিতে পারে।
ড. আলিমুর রেজার কথায়, বর্তমান এআই গবেষণার লক্ষ্য হলো এমন স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট তৈরি করা যা মিনিমাম মানব হস্তক্ষেপে কাজ করবে। কিন্তু এই “মিনিমাম” শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মানবহীন ব্যবস্থা সবসময় যুক্তিসঙ্গত নাও হতে পারে। কোথাও হয়তো পর্যবেক্ষণ দরকার, কোথাও সীমারেখা নির্ধারণ দরকার, কোথাও জরুরি থামার ব্যবস্থা দরকার। তাই স্বয়ংক্রিয়তার সঙ্গে দায়িত্বশীল নকশা, নীতিমালা, এবং ব্যবহারিক বাস্তবতাও সমান জরুরি।
এখানেই ড. আলিমুর রেজার বক্তব্য শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা মূল্য বহন করে। কারণ তিনি মনে করিয়ে দেন—রোবট বানানো মানে শুধু হার্ডওয়্যার বা যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো নয়; এটা এক ধরনের চিন্তা-প্রশিক্ষণ। পরিবেশ বুঝতে শেখানো, সিদ্ধান্তের যুক্তি তৈরি করা, ভুল হলে আবার শেখানো—এই পুরো প্রক্রিয়া গণিত, প্রোগ্রামিং ও কৌতূহলের সমন্বয়ে এগিয়ে যায়। আজ আপনি যে অঙ্ক শেখেন, যে লজিক অনুশীলন করেন, বা যে ছোট কোড লিখে পরীক্ষা করেন—সেখান থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের সেই অটোনমাস সহকারী, যে মানুষের পাশে থাকবে নিঃশব্দে।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment