ড.রিপন সিকদার,
ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (সীড), পার্টনার, বিএডিসি, ঢাকা
ইমেইল: [email protected]
ফুল মানেই সৌন্দর্য, আবেগ আর নান্দনিকতার প্রকাশ। হাজার বছর ধরে মানুষ ফুলের রঙ, গঠন ও ঘ্রাণ উন্নত করতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রচলিত সংকরায়ণ বা প্রজনন পদ্ধতিতে লাল গোলাপকে আরও লাল করা গেছে, সাদা ফুলকে আরও উজ্জ্বল করা গেছে কিন্তু কিছু রঙ ছিল যেন অধরা। বিশেষ করে নীল গোলাপ ছিল দীর্ঘদিন কল্পনার প্রতীক।
বায়োটেকনোলজির অগ্রগতির ফলে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। কীভাবে? আসুন জানি ফুলের রঙের আণবিক রহস্য।
ফুলের রঙের ভেতরের বিজ্ঞান
ফুলের রঙ মূলত তিন ধরনের রঞ্জক থেকে আসে: ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড এবং বেটালেইন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফ্ল্যাভোনয়েডের একটি অংশ হলো অ্যান্থোসায়ানিন। এই যৌগই ফুলকে লাল, গোলাপি, বেগুনি কিংবা নীল রঙ দেয়।
অ্যান্থোসায়ানিনের রঙ নির্ভর করে তার রাসায়নিক কাঠামোর ওপর। প্রধান তিনটি ভিত্তি যৌগ হলো:
- Pelargonidin-উজ্জ্বল লাল
- Cyanidin-লালচে-বেগুনি
- Delphinidin-নীল বা নীলাভ-বেগুনি
নীল রঙের জন্য অপরিহার্য Delphinidin। কিন্তু সমস্যা হলো, গোলাপ প্রজাতিতে স্বাভাবিকভাবে Delphinidin উৎপাদনের জৈবরাসায়নিক পথ নেই। তাই শত শত বছর প্রজনন করেও নীল গোলাপ তৈরি করা যায়নি।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: রঙ বদলের চাবিকাঠি
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে ফুলের রঙ নির্ধারণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম কাজ করে: F3′H এবং F3′5′H। এর মধ্যে F3′5′H এনজাইম Delphinidin তৈরিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
গোলাপে যেহেতু এই এনজাইমটি নেই, তাই গবেষকরা অন্য উদ্ভিদ, যেমন পিটুনিয়া বা প্যানজি থেকে F3′5′H জিন আলাদা করে গোলাপে প্রবেশ করান। পাশাপাশি, গোলাপের ভেতরের কিছু প্রতিযোগী এনজাইমকে RNAi প্রযুক্তির মাধ্যমে দমন করা হয়, যাতে নতুন পথটি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
এই যৌথ কৌশলের ফলে গোলাপে Delphinidin তৈরি সম্ভব হয় এবং জন্ম নেয় নীলাভ গোলাপ।
২০০৯ সালে জাপানে বাজারে আসে প্রথম বাণিজ্যিক “নীল” গোলাপ-Suntory Blue Rose “APPLAUSE™”। যদিও রঙ পুরোপুরি আকাশী নয়, তবে প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতিতে যা অসম্ভব ছিল, তা বায়োটেকনোলজি সম্ভব করেছে।
“মুন সিরিজ” কার্নেশন: রঙে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
গোলাপের আগেই কার্নেশন ফুলে সফল হয় রঙ পরিবর্তনের প্রযুক্তি। “মুন সিরিজ” নামে পরিচিত একাধিক কার্নেশন জাত, যেমন Moondust™, Moonshadow™, Moonvista™ বিশ্ববাজারে বিপুল সাফল্য পায়।
এই ফুলগুলোতে Delphinidin-এর পরিমাণ ৯০-৯৫% পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলাফল নীলাভ-বেগুনি আভা, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। লক্ষ লক্ষ এই ট্রান্সজেনিক ফুল বিশ্বব্যাপী বিক্রি হয়েছে, এবং এখন পর্যন্ত পরিবেশ বা মানবস্বাস্থ্যের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া যায়নি।
শুধু জিন নয়, রঙের পেছনে আরও অনেক কারণ
ফুলের চূড়ান্ত রঙ কেবল একটি রঞ্জকের ওপর নির্ভর করে না। আরও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
- কোষের ভেতরের অম্লতা (vacuolar pH)
- ধাতব আয়ন যেমন Fe3⁺ বা Mg²⁺
- সহ-রঞ্জক (co-pigment)
- কোষের গঠন ও আলো প্রতিফলন
উদাহরণস্বরূপ, কিছু টিউলিপে Fe²⁺ আয়নের ঘনত্ব বেশি হলে নীল রঙ দেখা যায়। আবার জাপানি মর্নিং গ্লোরিতে ফুল ফোটার সময় কোষের pH পরিবর্তনের ফলে রঙ বেগুনি থেকে নীলে রূপান্তরিত হয়।
অর্থাৎ, ফুলের রঙ হলো রাসায়নিক ও কোষীয় প্রক্রিয়ার এক সূক্ষ্ম সমন্বয়।
জিন প্রবাহের ঝুঁকি কতটা?
অনেকেই প্রশ্ন করেন-জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত ফুল কি পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?
কার্নেশন ও গোলাপের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অত্যন্ত কম। কারণ:
- অধিকাংশ বাণিজ্যিক কার্নেশন বীজ তৈরি করে না
- দ্বিগুণ পাপড়িযুক্ত হওয়ায় পরাগায়ন কঠিন
- কাট-ফুল হিসেবে বিক্রি হওয়ায় বীজ গঠনের সুযোগ নেই
- কিছু ক্ষেত্রে ট্রান্সজিন কেবল পাপড়ির কোষে সীমাবদ্ধ থাকে
বিভিন্ন দেশে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত প্রভাব দেখা যায়নি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ইচ্ছেমতো ফুল ফোটানো
গবেষণা এখন কেবল রঙেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন FT (FLOWERING LOCUS T) জিন নিয়ে, যা উদ্ভিদের “ফ্লোরিজেন” হরমোনের অংশ। এই জিন নিয়ন্ত্রণ করে কখন গাছ ফুল ফুটাবে।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে-
- নির্দিষ্ট সময়ে গাছে ফুল ফোটানো
- বাজারচাহিদা ভিত্তিক ফুল উৎপাদন
- ফলন বৃদ্ধিতে ফুল ফোটানো বিলম্বিত করণ সম্ভব হতে পারে।
ফুল প্রযুক্তির বিস্ময়কর দিগন্ত
ফুলকে কেন্দ্র করে আরও নানা প্রযুক্তি বিকাশ পাচ্ছে। যেমন:
- রোবোটিক ফুল
- পরাগকণা-প্রেরিত ওষুধ পরিবহন ব্যবস্থা
- ন্যানোস্ট্রাকচার ভিত্তিক উজ্জ্বল রঙ প্রযুক্তি
ফুল কেবল নান্দনিকতার নয়-প্রকৌশল, চিকিৎসা ও শক্তি প্রযুক্তির অনুপ্রেরণাও হয়ে উঠেছে।
উপসংহার: বিজ্ঞান ও সৌন্দর্যের মিলন
ফুলের রঙ পরিবর্তন একসময় ছিল কেবল উদ্যানতত্ত্ববিদদের স্বপ্ন। আজ তা আণবিক জীববিজ্ঞান, জিন প্রকৌশল ও কোষীয় রসায়নের বাস্তব প্রয়োগ।
নীল গোলাপ হয়তো এখনো আকাশের মতো নয়, কিন্তু এটি প্রমাণ করেছে-প্রকৃতির জৈবরাসায়নিক সীমা বোঝা গেলে, নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, সৌন্দর্যও বিজ্ঞানের হাত ধরে নতুন রূপ পেতে পারে।

Leave a comment