পৃথিবীর প্রযুক্তি জগত আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের মতো চিন্তা করা কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব বিষয় একসময় ছিল কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করছেন, যেখানে মেশিন শুধু তথ্য বিশ্লেষণই করে না, বরং ছবি দেখে বুঝতেও পারে—কোনটি মানুষ, কোনটি রাস্তা, কোথায় গাছ, কোথায় ভবন। এই প্রযুক্তির পেছনে কাজ করছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের গবেষকরা। তাদের মধ্যেই একজন বাংলাদেশি গবেষক ড. আলিমুর রেজা, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ড্রেক ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
ড. আলিমুর রেজার গবেষণার মূল লক্ষ্য এক কথায় বললে—মেশিনকে মানুষের মতো “দেখতে” শেখানো। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার একটি বড় অংশ এখন এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই এগোচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগার
ড. আলিমুর রেজার শিক্ষা ও গবেষণার যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশেই। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
যুক্তরাষ্ট্রে তিনি প্রথমে ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া থেকে ২০১৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনে তিন বছর পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন।
এরপর শুরু হয় তার বর্তমান অধ্যাপনা জীবন। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেক ইউনিভার্সিটিতে টেনিউর-ট্র্যাক সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন এবং সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং পড়াচ্ছেন।
তার গবেষণা জীবনের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো—পড়াশোনার সময় তিনি মার্কিন আর্মি রিসার্চ ল্যাব এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 3M-এও গবেষণা ইন্টার্নশিপ করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বিশাল এক জগৎ
ড. আলিমুর রেজার গবেষণার মূল ক্ষেত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI)। কিন্তু AI একটি বিশাল ক্ষেত্র। এর ভেতরে রয়েছে অনেক উপক্ষেত্র—যেমন মেশিন লার্নিং, কম্পিউটার ভিশন, রোবটিক্স ইত্যাদি। ডঃ রেজা বিশেষভাবে কাজ করেন কম্পিউটার ভিশন (Computer Vision) নামে পরিচিত একটি শাখায়। সহজভাবে বললে, কম্পিউটার ভিশন এমন প্রযুক্তি যেখানে কম্পিউটারকে ছবি বা ভিডিও দেখে বাস্তব জগত বুঝতে শেখানো হয়।
একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। আমরা মানুষ যখন একটি ছবি দেখি, তখন খুব সহজেই বুঝতে পারি—এখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, পাশে একটি গাছ, আর পেছনে একটি বাড়ি। কিন্তু একটি কম্পিউটারের কাছে ছবি হলো কেবল লক্ষ লক্ষ পিক্সেলের সমষ্টি। সেই পিক্সেল থেকে “মানুষ”, “গাছ” বা “বাড়ি” চিনতে শেখানোই হলো কম্পিউটার ভিশনের কাজ।
এই প্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে মেশিন লার্নিং এবং রোবটিক্স। ড. রেজার গবেষণায় এই তিনটি ক্ষেত্র—
- কম্পিউটার ভিশন
- মেশিন লার্নিং
- রোবটিক্স
একসাথে কাজ করে।
রোবটকে আশপাশের পৃথিবী বোঝানো
ড. রেজার পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় ছিল “Scene Understanding for Robotic Application”। এখানে “সিন” বলতে বোঝানো হয় আশপাশের দৃশ্য। অর্থাৎ একটি রোবট কীভাবে তার চারপাশের পরিবেশ বুঝবে। ধরা যাক, ভবিষ্যতে এমন একটি রোবট তৈরি হলো, যেটি বাসার ভেতরে কাজ করবে—ঘর পরিষ্কার করবে, জিনিসপত্র এনে দেবে। এখন প্রশ্ন হলো—রোবট কীভাবে বুঝবে কোথায় টেবিল, কোথায় মানুষ, কোথায় দেয়াল? এই সমস্যার সমাধানেই ব্যবহৃত হয় একটি প্রযুক্তি যার নাম সেমান্টিক সেগমেন্টেশন (Semantic Segmentation)।
সহজ ভাষায় এটি হলো একটি ছবিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা এবং প্রতিটি অংশকে আলাদা পরিচয় দেওয়া। যেমন—
- এই অংশটি মানুষ
- এই অংশটি মেঝে
- এই অংশটি দেয়াল
- এই অংশটি টেবিল
এইভাবে ছবি বিশ্লেষণ করতে পারলে রোবট বাস্তব পরিবেশে অনেক বেশি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
পানির নিচে এআই
ড. রেজার গবেষণা শুধু ঘর বা রাস্তার পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি তিনি পানির নিচের পরিবেশে (Underwater Environment) কম্পিউটার ভিশনের ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন। পানির নিচে কাজ করা প্রযুক্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সেখানে আলো কম, বস্তুগুলোর রং ও আকার ভিন্ন, আর পরিবেশও অস্থির। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য তার গবেষণা দল তৈরি করেছে এমন একটি সিস্টেম, যা পানির নিচের বিভিন্ন বস্তু শনাক্ত করতে পারে।
এর সম্ভাব্য ব্যবহার অনেক:
- মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
- সামুদ্রিক প্রাণীর আচরণ বিশ্লেষণ
- মাছ চাষ বা অ্যাকুয়াকালচার মনিটরিং
- সমুদ্র গবেষণা
উদাহরণ হিসেবে নর্ডিক দেশগুলোর কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে বিশাল আকারে মাছ চাষ হয়। সেখানে এআই ব্যবহার করে মাছের স্বাস্থ্য বা আচরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
ছবির মাধ্যমে ৩ডি পৃথিবী তৈরি
ড. রেজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ক্ষেত্র হলো ৩ডি রিকনস্ট্রাকশন (3D Reconstruction)। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে সাধারণ ছবি থেকে একটি ত্রিমাত্রিক (3D) মডেল তৈরি করা যায়। ধরা যাক আপনি একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা একটি ভবনের ছবি তুললেন। উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সেই ছবির ভিত্তিতে পুরো ভবনের একটি ৩ডি মডেল তৈরি করা সম্ভব।
এই প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ:
- ভার্চুয়াল রিয়ালিটি
- গেমিং
- প্রত্নতত্ত্ব
- স্থাপত্য পরিকল্পনা
- রোবট নেভিগেশন
ভবিষ্যতে হয়তো এমন দিন আসবে, যখন একটি স্মার্টফোন দিয়ে কয়েকটি ছবি তুললেই কোনো জায়গার সম্পূর্ণ ৩ডি মডেল তৈরি হয়ে যাবে।
এআই, মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিং: পার্থক্য কী?
আজকাল এই তিনটি শব্দই আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু অনেকের কাছেই এগুলোর পার্থক্য পরিষ্কার নয়। ড. রেজার ভাষায় বিষয়টি সহজভাবে নিম্নে বোঝালেন:
Artificial Intelligence (AI) হলো একটি বড় ছাতা। এর লক্ষ্য হলো এমন প্রযুক্তি তৈরি করা যা মানুষের মতো বুদ্ধিমান আচরণ করতে পারে। এর ভেতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো Machine Learning। এখানে কম্পিউটারকে সরাসরি নিয়ম না বলে ডেটা থেকে শেখানো হয়। আর Deep Learning হলো মেশিন লার্নিংয়ের আরও আধুনিক একটি পদ্ধতি, যেখানে ব্যবহৃত হয় নিউরাল নেটওয়ার্ক—যা মানুষের মস্তিষ্কের গঠন থেকে অনুপ্রাণিত। এই ধারার শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে পারসেপট্রন (Perceptron) নামের একটি সহজ নিউরাল মডেল দিয়ে। পরে ধীরে ধীরে তৈরি হয় আরও জটিল নেটওয়ার্ক—যেমন:
- Convolutional Neural Network (CNN)
- Recurrent Neural Network (RNN)
- Transformer
আজকের অনেক আধুনিক এআই প্রযুক্তি এই ডিপ লার্নিং পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।
এআই ক্যারিয়ার: কী শিখতে হবে?
যারা এআই বা রোবটিক্সে ক্যারিয়ার করতে চান, তাদের জন্য ড. রেজার পরামর্শ স্পষ্ট— প্রথমত, শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) বিষয়ে। এরপর দরকার তিনটি বিষয়:
১. তত্ত্ব বোঝা: মেশিন লার্নিংয়ের গাণিতিক ভিত্তি ও অ্যালগরিদম বুঝতে হবে।
২. বাস্তব প্রয়োগ: শুধু তত্ত্ব জানলেই হবে না। বাস্তব ডেটাসেট ব্যবহার করে কাজ করতে হবে।
৩. প্রোগ্রামিং দক্ষতা: বর্তমানে এআই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হলো Python।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ লাইব্রেরি হলো: Scikit-learn, PyTorch, TensorFlow। রোবটিক্স শেখার জন্য বাস্তব রোবট না থাকলেও সমস্যা নেই। বিভিন্ন সিমুলেটর ব্যবহার করা যায়—যেমন Gazebo বা Habitat।
ঢাকা শহরের যানজট: এআই কি সমাধান দিতে পারে?
ঢাকার যানজট নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ড. রেজা একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার মতে, এটি শুধু প্রযুক্তির সমস্যা নয়—বরং ডেমোগ্রাফির সমস্যা। অর্থাৎ শহরের ধারণক্ষমতার তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেশি। তবে প্রযুক্তি কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। যেমন: ক্যামেরা দিয়ে যানবাহন ট্র্যাক করা, স্বয়ংক্রিয় টোল সংগ্রহ, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে নজরদারি। বিশ্বের অনেক শহরে কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করে এসব ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
এআই: সম্ভাবনা না বিপদ?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়েও এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। ড. রেজা মনে করেন, এআই অনেকটা “Pandora’s Box” এর মতো—একবার খুলে গেলে সেটিকে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই সমাধান হলো প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা। তিনি উল্লেখ করেন নোবেলজয়ী গবেষক জেফ্রি হিন্টনের সতর্কতার কথা। হিন্টনের মতে, ভবিষ্যতের মেশিন ইন্টেলিজেন্স মানুষের চেয়েও দ্রুত জ্ঞান ছড়াতে পারে। কারণ ডিজিটাল সিস্টেমে জ্ঞান এক মেশিন থেকে আরেক মেশিনে খুব সহজেই কপি করা যায়। অন্যদিকে এআই গবেষক ইয়ান লেকুন আবার মনে করেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই মানুষের জন্য অনেক উপকার বয়ে আনবে।
শুধু ডিগ্রি নয়, শেখার আগ্রহ দরকার
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রসঙ্গে ডঃ রেজা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তার মতে, শুধু সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা অর্থহীন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জন, গবেষণা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করা। শুধু ডিগ্রি সংগ্রহ করলে ব্যক্তি বা সমাজ—কোনোটিই উপকৃত হয় না।
ভবিষ্যতের গবেষণা
ড. আলিমুর রেজার গবেষণার মূল ফোকাস ভবিষ্যতেও থাকবে তিনটি ক্ষেত্রে:
- সেমান্টিক সেগমেন্টেশন
- কম্পিউটার ভিশন
- 3D (ত্রিমাত্রিক) রিকনস্ট্রাকশন
এই প্রযুক্তিগুলো ভবিষ্যতের রোবটিক্স, স্বয়ংচালিত যান, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি এবং স্মার্ট শহর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা
বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে অধ্যাপক হওয়া—ড. আলিমুর রেজার যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখায় যে জ্ঞান, অধ্যবসায় এবং কৌতূহল থাকলে একজন তরুণ গবেষক বিশ্বমানের বিজ্ঞানচর্চায় অবদান রাখতে পারেন। আজকের বাংলাদেশি তরুণদের জন্য তার গল্প একটি বড় শিক্ষা—
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু উন্নত দেশের গবেষণাগারেই তৈরি হয় না; সঠিক প্রস্তুতি থাকলে সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশের তরুণরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যোগাযোগের তথ্য
📧 ইমেইল: [email protected]
🔗 প্রোফাইল লিংক
🎓 গুগল স্কলার: https://scholar.google.com/citations?user=RXcEJocAAAAJ&hl=en
💼 লিংকডইন: https://www.linkedin.com/in/alimoor-reza/
🌐 ওয়েবসাইট: https://analytics.drake.edu/~reza/
সাক্ষাকারটি ২৫ অক্টোবর ২০২৪ এ অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাৎকারটির উপস্থাপক ছিলেন জামিল রেজা।
ড. আলিমুর রেজার সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

Leave a comment