বিজ্ঞান শুধু বইয়ে নয়–কৃষকের হাতে পৌঁছালেই বদলাবে খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি এবং সবজি উৎপাদনেও বিশ্বে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রেখেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্য অনুযায়ী, ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম প্রধান উৎপাদক দেশ। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের দশকের পর দশক ধরে চালানো গবেষণা ও উদ্ভাবন। এক সময় যেখানে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য সংস্থান নিশ্চিত করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে আজ ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্যের জোগান আসছে এই দেশের মাটি থেকেই (BBS, 2023)।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়-গবেষণাগারের এই সাফল্য কি সত্যিই মাঠপর্যায়ের কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই সেতুবন্ধনই এখন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
সাফল্যের পরিসংখ্যান ও উদ্ভাবনের জয়যাত্রা
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার ভাণ্ডার আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এ পর্যন্ত ১২০টিরও বেশি উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যেগুলোর অনেকগুলোই জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে (BRRI Annual Report, 2022)।
লবণাক্ততা ও খরা মোকাবিলা: লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যেমন-ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬১, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯ ও ব্রি ধান১১২ জাতগুলো লবণাক্ত পরিবেশেও হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪-৫ টন ফলন দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ এলাকার জন্য উদ্ভাবিত ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১ ব্রি ধান ৮৩ ও বিনা ধান-১৭ কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
পাশাপাশি জলমগ্নতা সহিষ্ণু জাতের মধ্যে ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান১০৯ ও ব্রি ধান১১০ কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প তৈরি করেছে।
জেনোম সিকোয়েন্সিং: বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা তোষা পাটের পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করে আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এই গবেষণা ভবিষ্যতে পাটের আঁশের মান উন্নয়ন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে (Islam et al., Nature Communications, 2017)।
স্মার্ট এগ্রিকালচার: ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের রোগ নির্ণয় এবং সুনির্দিষ্টভাবে সার প্রয়োগের পরীক্ষা ইতোমধ্যে সফল হয়েছে। পাশাপাশি আইওটি (IoT) ভিত্তিক স্মার্ট সেচ প্রযুক্তি মাটির আর্দ্রতা পরিমাপ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি সরবরাহ করতে পারে, যার ফলে সেচ ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বাস্তব চ্যালেঞ্জ: যেখানে থমকে যায় উদ্ভাবন
এতসব অর্জন সত্ত্বেও কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক বাঁধা উদ্ভাবনের পূর্ণ সুবিধা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে দিচ্ছে না। এই চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি:
১. প্রযুক্তি হস্তান্তরের ধীরগতি (Extension Gap): গবেষণাগারে একটি নতুন জাত উদ্ভাবনের পর তা সাধারণ কৃষকের মাঠে পৌঁছাতে গড়ে ৫-৭ বছর সময় লাগে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) তথ্য অনুযায়ী, একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গড়ে প্রায় ৮০০-১০০০ জন কৃষককে সেবা প্রদান করেন। ফলে নতুন প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২. উচ্চ বিনিয়োগ ও যান্ত্রিকীকরণের অভাব: আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অনেক যন্ত্রপাতি এখনও ক্ষুদ্র কৃষকের নাগালের বাইরে। একটি কম্বাইন হারভেস্টার বা রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মূল্য কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সরকার ৫০-৭০% ভর্তুকি দিলেও দক্ষ অপারেটর ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক যন্ত্র পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না।

৩. তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহা: বাংলাদেশের গড় কৃষকের বয়স এবং তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা একটি বড় বাঁধা। অনেক সময় জটিল বৈজ্ঞানিক টার্ম বা স্মার্ট অ্যাপের ইন্টারফেস সাধারণ কৃষকের কাছে ভীতি সৃষ্টি করে। ফলে তারা আধুনিক পদ্ধতির চেয়ে সনাতন ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
৪. বাজারব্যবস্থার ত্রুটি ও সিন্ডিকেট: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (BIDS) এক সমীক্ষা অনুযায়ী, কৃষিপণ্য ভোক্তার থালা পর্যন্ত পৌঁছাতে ৩ থেকে ৪টি ধাপ পার করতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না, যা তাকে নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করে।
উত্তরণের পথ: বিজ্ঞানকে নিয়ে যেতে হবে মাটিতে
গবেষণাগার আর ফসলের মাঠের এই দূরত্ব ঘোচাতে হলে আমাদের ‘ল্যাব-টু-ল্যান্ড’ (Lab-to-Land) মডেলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে:
বিগ ডাটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): কৃষকের হাতে থাকা স্মার্টফোনটিকে একটি ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কৃষক স্মার্টফোন দিয়ে পাতার ছবি তুলে তাৎক্ষণিকভাবে রোগ শনাক্ত করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পরামর্শ পেতে পারবেন।এআই-ভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে কৃষক যেন মুহূর্তেই তার ফসলের রোগের ছবি তুলে সমাধান পেতে পারেন।
টেক-বান্ধব কৃষি উদ্যোক্তা: শিক্ষিত তরুণদের ‘এগ্রি-স্টার্টআপ’ তৈরিতে উৎসাহিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মই ড্রোন চালনা বা স্মার্ট ফার্মিংয়ের ধারণা মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয় করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP): সরকারি গবেষণার সাথে বেসরকারি বীজ কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় ঘটাতে হবে। এতে উদ্ভাবিত বীজের বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং খরচ কমবে।
উপসংহার
বিজ্ঞানের সার্থকতা আলমারিতে সাজিয়ে রাখা থিসিস পেপার বা দামি জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে নয়, বরং কৃষকের তৃপ্তির হাসিতে। বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা দেশের মাটির জন্য যে ‘ম্যাজিক’ তৈরি করছেন, তার সুফল প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি ক্ষুধামুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে বিজ্ঞান আর লাঙলকে একই সমান্তরালে চলতে হবে।
গবেষণাগার, নীতিনির্ধারক এবং কৃষকের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ কৃষি উদ্ভাবনের একটি বৈশ্বিক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক:
ড. রিপন সিকদার,
ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (বীজ), পার্টনার প্রকল্প, বিএডিসি, ঢাকা

Leave a comment