বিজ্ঞানীদের জীবনী

আলোর গতিতে ভবিষ্যৎ: অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ে ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের গবেষণা-যাত্রা

Share
Share

আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি স্তরে কম্পিউটিং প্রযুক্তি আজ অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে মহাকাশ গবেষণা—সবখানেই দ্রুততর ও শক্তিশালী কম্পিউটারের প্রয়োজন বাড়ছে। কিন্তু প্রচলিত ইলেকট্রনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ধীরে ধীরে একটি সীমায় এসে দাঁড়াচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে বিকল্প এক ভবিষ্যৎ পথের কথা ভেবেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিম। তাঁর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অপটিক্যাল কম্পিউটিং—যেখানে বিদ্যুতের পরিবর্তে আলো ব্যবহার করে গণনা করা হয়।

ডক্টর করিমের একাডেমিক যাত্রার শুরু পদার্থবিজ্ঞানে। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সময় বায়োফিজিক্স ও কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সে গবেষণা করে তিনি বুঝতে শুরু করেন, প্রকৃতির মৌলিক নীতিগুলো প্রযুক্তিতে প্রয়োগের কত বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। পরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসে তিনি ইমেজ প্রসেসিং ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ নিয়ে কাজ করেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—বর্তমান কম্পিউটার প্রযুক্তির গতি ও ক্ষমতা কীভাবে বহুগুণ বাড়ানো যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের দিকে মনোযোগ দেন। অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের মূল ধারণা হলো আলোকে তথ্য বহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। আলো একসঙ্গে বহু পথে ছড়িয়ে যেতে পারে, ফলে একই সময়ে অনেক কাজ করা সম্ভব হয়। বিষয়টি সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, বিদ্যুৎ দিয়ে তথ্য পাঠানো মানে যেন একটিমাত্র রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল করা, আর আলো দিয়ে তথ্য পাঠানো মানে একসঙ্গে বহু লেনের মহাসড়ক ব্যবহার করা। এর ফলে গণনার গতি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

ডক্টর করিমের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ। নাইট ভিশন ডিসপ্লে, উন্নত অপটিক্যাল সেন্সর ও দ্রুতগতির ইমেজ প্রসেসিং সিস্টেমে তাঁর কাজ সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিশেষ করে কম আলোতে স্পষ্টভাবে দেখার প্রযুক্তি উদ্ধার অভিযান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

তবে তাঁর গবেষণা-জীবন কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একাডেমিক নেতৃত্বের ভূমিকায় থেকে তিনি গবেষণার অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, ভালো গবেষণা কেবল একজন ব্যক্তির মেধায় গড়ে ওঠে না; বরং প্রয়োজন হয় একটি সহায়ক পরিবেশ, দক্ষ দল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই দর্শন থেকেই তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন গবেষণা কর্মসূচি ও বিভাগ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন।

ডক্টর করিমের এই পথচলা বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বিশ্বমানের গবেষণা সম্ভব—এই বার্তাই তিনি বারবার তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের শুধু সংকীর্ণ সমস্যার সমাধানে আটকে থাকলে চলবে না; বড় ছবিটা দেখতে শিখতে হবে। প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব, মানবকল্যাণে তার ভূমিকা এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান—এসব বিষয় মাথায় রেখে গবেষণার দিক নির্ধারণ করাই ভবিষ্যতের সাফল্যের চাবিকাঠি।

আলোর গতিতে এগিয়ে চলা এই গবেষণা-যাত্রা তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত অভিযাত্রা নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের জন্য সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দিগন্ত।

ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org