আজকের দিনে “এআই” শব্দটি এত দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে যে অনেক শিক্ষার্থী বুঝতেই পারে না—কোনটা আসলে এআই, কোনটা মেশিন লার্নিং, আর কোনটা ডিপ লার্নিং। ফলে শেখার শুরুতেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কিন্তু এই তিনটি ধারণাকে পরপর সাজিয়ে ভাবতে পারলে, প্রযুক্তির জগৎটা অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়।
প্রথমে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ধরুন একটি বড় লক্ষ্য হিসেবে। লক্ষ্যটি হলো এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যা মানুষের মতো বুদ্ধিমান আচরণ করতে পারে—যেমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান করা, ভাষা বোঝা, ছবি দেখে চিনে ফেলা, কিংবা পরিকল্পনা করে কাজ করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নানা পথ আছে। ঠিক যেমন আপনি শহরে যেতে পারেন বাসে, ট্রেনে, বা হাঁটতে হাঁটতে—একই গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ একাধিক। এআইও তেমনই; এটি একটি ছাতা, যার নিচে নানা পদ্ধতি থাকতে পারে।
এই ছাতার নিচে সবচেয়ে পরিচিত এবং বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মেশিন লার্নিং। মেশিন লার্নিং মানে ডেটা থেকে শেখা। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন আমরা উদাহরণ দেখে শিখি—অনেকবার বিড়াল দেখলে বিড়াল চিনে ফেলি—মেশিন লার্নিংও তেমনভাবে উদাহরণ (ডেটা) দেখে একটি নিয়ম নিজে নিজে তৈরি করতে শেখে। আপনি তাকে হাত ধরে বলে দেন না, “এইভাবে চিনবে”; বরং আপনি তাকে প্রচুর উদাহরণ দেখান, আর সে তার ভেতরে একটি ‘প্যাটার্ন’ তৈরি করে। ড. আলিমুর রেজা বলেন, মেশিন লার্নিংকে আরও নির্দিষ্টভাবে স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেশিন লার্নিং বলা যায়, কারণ এতে পরিসংখ্যানের ধারণা (সম্ভাবনা, গড়, বিচ্যুতি, ভুলের পরিমাপ) খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
এরপর আসে ডিপ লার্নিং। ডিপ লার্নিং হলো মেশিন লার্নিংয়ের এমন একটি শাখা, যেখানে শেখার ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করা হয় নিউরাল নেটওয়ার্ক। নিউরাল নেটওয়ার্ককে আপনি মানুষের মস্তিষ্কের অনুকরণে তৈরি একটি গণনামডেল ভাবতে পারেন—যেখানে অনেকগুলো ছোট ছোট ইউনিট (নিউরনের মতো) একসাথে কাজ করে। ডিপ লার্নিংয়ের ডিপ শব্দটি নিয়ে ড. আলিমুর রেজার ব্যাখ্যা খুব সহজ: ডেপথ মানে স্তর। অর্থাৎ নেটওয়ার্কের ভেতরে একাধিক লুকানো স্তর থাকে, যেগুলো ধাপে ধাপে বৈশিষ্ট্য বের করে। মানুষের মতো করে বললে, আপনি যখন কাউকে চিনেন, আপনি একবারে সব সিদ্ধান্ত নেন না; প্রথমে চেহারার কাঠামো, তারপর চোখ-মুখের রেখা, তারপর পরিচিত অভিব্যক্তি—এসব মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ডিপ লার্নিংও এক অর্থে এমন ধাপে ধাপে বোঝার চেষ্টা।
ড. আলিমুর রেজা তার পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, তিনি ক্লাস শুরু করেন পারসেপট্রন দিয়ে—যা ১৯৫৮ সালে প্রস্তাবিত একটি সহজ নিউরাল ধারণা। পরে ধীরে ধীরে আসে মাল্টি-লেয়ার পারসেপট্রন, কনভলিউশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক, রিকারেন্ট নিউরাল নেটওয়ার্ক, এবং সাম্প্রতিক সময়ের ট্রান্সফরমার। শিক্ষার্থীদের কাছে এই ইতিহাসটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বোঝা যায় প্রযুক্তি একদিনে হঠাৎ আসে না; ছোট ধারণার ওপর বড় ধারণা দাঁড়ায়। আর নতুন নতুন মডেল আসার পেছনে একটি বড় বিষয় হলো আর্কিটেকচার ডিজাইন—অর্থাৎ নেটওয়ার্কের গঠন কীভাবে সাজালে শেখা আরও ভালো হবে। ড. আলিমুর রেজার ভাষায়, অনেক সময় মানুষ এখন লার্নিং নিয়ে যতটা না ভাবছে, তার চেয়ে বেশি ভাবছে কীভাবে নেটওয়ার্ককে ভিন্নভাবে সাজানো যায়, যাতে আরও ভালো বুদ্ধিমত্তা অর্জন করা যায়।
তবে এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে শিক্ষণীয় অংশ হলো তার ‘বাস্তববাদ’। তিনি বলেন, কৌশল বা টুলকে কেন্দ্র করে নয়, সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভাবা জরুরি। কারণ সুপারভাইজড, আনসুপারভাইজড, রিনফোর্সমেন্ট—সব ধরনের লার্নিংয়েরই প্রয়োগ আছে। আপনি কোনটা করবেন, তা নির্ভর করবে আপনি আসলে কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তার উপর। এই চিন্তাটি শিক্ষার্থীর জন্য দারুণ পথনির্দেশ। কারণ অনেকেই ট্রেন্ড দেখে দৌড়ায়—আজ ট্রান্সফরমার, কাল অন্য কিছু। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চার ভিত শক্ত হয় প্রশ্নের মাধ্যমে। আপনি প্রশ্ন ঠিক করতে পারলে, টুল ঠিক করার কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment