গত কয়েক বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতিকে ঘিরে যে সবারই এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন নতুন এক বাঁকে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সাবেক গুগল সিইও এরিক শ্মিট দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন—সিলিকন ভ্যালির কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই নিয়ে বেপরোয়া দৌড় কার্যত ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। এজিআই মানে এমন এক যন্ত্র, যা মানুষের মতো বা তার থেকেও বেশি পর্যায়ে চিন্তা ও যুক্তি প্রয়োগ করতে পারবে। এটি এখনো নিছক বিজ্ঞানকল্পকাহিনী, কিন্তু প্রযুক্তি-বাজারের আলোচনায় যেন একক প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
এরিকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের উচিত হবে এখনকার বাস্তবসম্মত প্রয়োগে মনোযোগ দেওয়া—যে প্রয়োগ তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য তৈরি করে। তার আশঙ্কা, এজিআই-র শূন্য হাইপে মগ্ন থেকে আমেরিকা পিছিয়ে পড়তে পারে চীনের কাছে, যে দেশ বরাবরের মতো বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এআই ব্যবহার করছে এবং পরীক্ষিত প্রযুক্তিকে শিল্প ও প্রশাসনে প্রয়োগ করছে।
অনেকটা একই রকমের সুরে বলেন ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমানে মাইক্রোসফটের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেইমান। তার মতে, এআইকে মানুষের মতো বানানোর দৌড়ে বিভ্রান্ত না হয়ে মানুষের জন্য এআই বানানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। মানুষের মতো এবং মানুষের জন্য – এই দুটির মধ্যে মারাত্মক পার্থক্য রয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, সচেতন এআই বানানোর দিকের এই প্রতিযোগিতা এখন পুরে ইন্ডাস্ট্রি এবং বিশ্বের জন্য বিপথগামী হয়ে উঠছে, আর প্রত্যাশাগুলোকে বাস্তবসম্মতভাবে নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি।
এমনকি ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান, যিনি সাধারণত এআই নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দেন, সাম্প্রতিক সময়ে শীতলতা প্রকাশ করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, একটি “এআই বুদবুদ” তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, বুদ্ধিমান মানুষরা “একটি সামান্য সফলতাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন।” তিনি এমনকি তুলনা টেনেছেন ডটকম বুদবুদের সঙ্গে, যেখানে শেষ পর্যন্ত কেউ “অবিশ্বাস্য পরিমাণ অর্থ হারাবেই।”
কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? প্রথমত, এআই-এর বর্তমান গবেষণা ও উন্নয়ন খরচ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও টেকসই ব্যবসায়িক মডেল স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, এজিআই কখন সম্ভব হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। তৃতীয়ত, নানা দেশের নতুন নিয়মকানুন প্রযুক্তির গতি শ্লথ করছে। এদিকে কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য এখনো আকাশচুম্বী, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে নজর দিচ্ছেন স্থায়িত্ব ও বাস্তবসম্মত মূল্য তৈরির দিকে।
এই সংশোধন আসলে এআই খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক। কারণ অতিরিক্ত উন্মাদনা ও অযৌক্তিক প্রত্যাশা ভেঙে গিয়ে যদি শিল্প আবার বাস্তব প্রয়োগের পথে ফিরে আসে, তবে প্রকৃত উদ্ভাবন টেকসই হবে। এআই যে চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি কিংবা শিল্প ব্যবস্থায় প্রতিদিনকার সমস্যার সমাধান দিতে পারে, সেই দিকেই মনোযোগ দেওয়া জরুরি। প্রযুক্তির ইতিহাসে দেখা গেছে—যখনই একটি ক্ষেত্র অতিরিক্ত হাইপে ভরে ওঠে, তখন অনিবার্যভাবে আসে হতাশার ঢেউ। কিন্তু যারা টিকে যায়, তারাই গড়ে তোলে পরবর্তী বিপ্লবের ভিত।
বাংলাদেশের জন্য এই বৈশ্বিক আলোচনার তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই প্রযুক্তিগত দৌড়ে অংশ নিতে গিয়ে ভুল জায়গায় বিনিয়োগ করে ফেলে। আজ এজিআই বা সায়েন্স ফিকশন ধাঁচের কল্পনার পেছনে ছুটে চলা যদি আমাদের নীতি নির্ধারণীদেরও বিভ্রান্ত করে, তবে সেটি হবে মারাত্মক ভুল। বরং আমাদের উচিত বিদ্যমান এআই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অতএব, এআই বুদবুদের ভাঙনের লক্ষণ যতই আতঙ্কজনক মনে হোক না কেন, এটি প্রকৃতপক্ষে একটি সাধারণ সংশোধন। এটি আমাদেরকে শিখিয়ে দিচ্ছে—স্বপ্ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে হতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এই বার্তা আরও জরুরি। কারণ আমাদের কাছে স্বপ্নের অভাব নেই, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ধৈর্য, দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবমুখী বিনিয়োগ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, অর্থনীতি, পরিবহন ও শিল্প—এসব ক্ষেত্রেই যদি আমরা সঠিকভাবে এআই ব্যবহার করতে পারি, তবে তা আমাদের অর্থনীতি ও সমাজকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারবে।

Leave a comment