বিজ্ঞানীদের জীবনী

“বিজ্ঞান শুধু বই পড়া নয়, নিজেই কিছু তৈরি করে তা প্রমাণ করা” — ড. আবুল হুস্সাম

Share
Share

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমে বিজ্ঞানের বইগুলোকে ভারি ও জটিল টেক্সট বই বলে মনে হতে পারে, কিন্তু একজন প্রকৃত বিজ্ঞানী জানেন—বিজ্ঞান শুরু হয় কৌতূহল থেকে, এবং পূর্নতা পায় হাতে-কলমে কোনো কিছু তৈরি করে তা সত্যিই কাজ করে কি না পরীক্ষা করে দেখায়। “বিজ্ঞান শুধু বই পড়া নয়, নিজেই কিছু তৈরি করে তা প্রমাণ করা”— এই কথা বলেছেন জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানালিটিক্যাল রসায়নের প্রফেসর ও ক্লিন ওয়াটার টেকনোলজিস-এর পরিচালক ড. আবুল হুস্সাম। তাঁর জীবন ও কাজ দেখিয়ে দিয়েছে এই এক কথার গভীর অর্থ কী হতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রামবাংলার আর্সেনিক দূষণ-সংকট যখন গোটা দেশকে বিপর্যস্ত করছিল, তখন আর কারো মতো বইয়ের ভেতর বসেই এই সমস্যা সমাধানের কথা ভাবেননি ড. হুস্সাম। বরং তিনি খুঁজে বের করেছেন এমন একটি প্রযুক্তি, যা গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও ব্যবহার করতে পারে—এটাই হলো তাঁর উদ্ভাবিত সোনো ফিল্টার। এটি শুধু একটি গবেষণাপত্র বা প্রযুক্তি নয়, বরং বাস্তবে কাজ করে নিরাপদ পানি সরবরাহের সক্ষম একটি বাস্তব খাঁচা।

ড. হুস্সাম বাংলাদেশি মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেও, শৈশব থেকেই বিজ্ঞানকে তিনি নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দেখেছেন। কুষ্টিয়ার ছোট শহরে বাবা ছিলেন চিকিৎসক, কিন্তু বাবা-পাশের প্যাথলজি ল্যাবে ঘুরে বেড়ানো, রঙিন সল্যুশন ও বিভিন্ন কাচের যন্ত্রপাতি দেখেই তাঁর মনে জন্ম নেয় যন্ত্রপাতি তৈরির আগ্রহ। এই আগ্রহই তাকে নিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি বিএসসি এবং এমএসসি শেষে আর পিছু তাকাননি।

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সময় তিনি অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রির মতো এক বিশেষ শাখায় থিসিস করেন, যেখানে মূল বিষয় ছিল “পরিমাপ”—কোনো পানিতে কী আছে এবং কতটুকু আছে, তা কিভাবে সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়। তবে ড. হুস্সাম জানতেন শুধু পরিমাপ জানা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে সমস্যার মোকাবিলা করতে হলে সেই জ্ঞানকে নিত্যদিনের বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি নিজেই বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করেছেন—শুধু বইয়ের ভেতর নয়, অভিজ্ঞতার মাটিতেই।

এখনকার দিনে যখন বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষরা নিরাপদ পানির সন্ধানে দৌড়াচ্ছেন, তখন সোনো ফিল্টারের মতো প্রযুক্তির মূল্য অপরিসীম। এই ফিল্টার আছে এমন প্রেক্ষাপটে যেখানে পানিতে থাকা আর্সেনিক মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। ফিল্টারটি খুব সহজ, কম খরচে তৈরি হয়, এবং বিশেষ যন্ত্র ছাড়াই এগুলোকে ব্যবহার করে নিরাপদ পানি পাওয়া যায়—এটাই “হাতে-কলমে বিজ্ঞান”এর এক নিদর্শন।

ড. হুস্সামের এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর, ভালো গ্রেড বা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা—এই নানান লক্ষ্যকে বিজ্ঞানচর্চার মূল উদ্দেশ্য মনে করেন। কিন্তু ড. হুস্সাম বলেছেন, “বিজ্ঞান শুধু বই পড়া নয়…”—বিজ্ঞান আসলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে আপনি নিজের হাতে কোনো সমাধান তৈরি করে তা বাস্তবে কাজ করছে কি না দেখাতে পারেন।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় STEM শিক্ষার উপর অনেক জোর দেওয়া হয়, কিন্তু প্র্যাকটিস বা বাস্তব সমস্যা সমাধানের সুযোগ কম। ড. হুস্সামের জীবন এই বাস্তবটাকেই সামনে নিয়ে আসে—যেনেই কোনো তরুণের মস্তিষ্ক থেকে কৌতূহল, প্রশ্ন এবং যথার্থ তৈরি করার ইচ্ছাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। বই পড়ে বোঝা এক ধরনের শিক্ষা, আর হাতে ঝোঁকা আর সমস্যা সমাধানে নেমে পড়া একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, আর গভীর শিক্ষা।

এই কারণে, তাঁর কথাটি শুধু একটি উদ্ধৃতি নয়—একটি শিক্ষাদর্শন, একটি কর্মদর্শন। “বিজ্ঞান শুধু বই পড়া নয়, নিজেই কিছু তৈরি করে তা প্রমাণ করা”— এই কথাটি দেশের বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশকে আবার একবার নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানাচ্ছে।

ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org