বাংলাদেশে “ডিজিটাল” শব্দটি আজ খুব পরিচিত—জাতীয় পরিচয়পত্র, অনলাইন সেবা, ই-গভর্ন্যান্স, সাবমেরিন কেবল—সবই যেন একই গল্পের অংশ। কিন্তু এই গল্পের পেছনে যে মানুষগুলোর দীর্ঘ গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আর দেশের জন্য নীরব পরিশ্রম জমা আছে—তাদের কথা খুব কমই আমরা জানি। ড. আব্দুল আউয়াল তেমনই একজন। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের মেধাবী ছাত্র থেকে জার্মানিতে পদার্থবিজ্ঞানের পড়াশোনা, তারপর নিউইয়র্কে লেজার প্রযুক্তি নিয়ে পিএইচডি, আর তার পরে বিশ্বখ্যাত AT&T Bell Laboratories-এ বছরের পর বছর উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক অনন্য জীবন—যে জীবনশেষে ফিরে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা ও সেবা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলাতে চেয়েছে।
ড. আউয়ালের সঙ্গে কথোপকথনে বারবার ফিরে আসে একটি মূল সুর—প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদু নয়; প্রযুক্তি হলো রাষ্ট্র ও মানুষের সমস্যার সমাধানকে দ্রুত, স্বচ্ছ, এবং ন্যায্য করার একটি হাতিয়ার। তিনি যেখানেই ছিলেন—ল্যাবে, কারখানার ব্যবস্থাপনায়, নীতিনির্ধারকের কক্ষে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে—প্রশ্নটি একটাই রেখেছেন: “এই জ্ঞান দিয়ে দেশের মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন কীভাবে আনা যায়?”
রাজশাহী থেকে জার্মানি—তারপর নিউইয়র্ক: এক শিক্ষাযাত্রার মানচিত্র
ড. আব্দুল আউয়ালের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাংলাদেশের পরিচিত পথেই, কিন্তু খুব দ্রুতই তা আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। মেট্রিক পাশ করার পর তিনি ভর্তি হন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম হওয়ার পর স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান জার্মানিতে, পড়েন পদার্থবিজ্ঞান (Physics)। চার বছর পর পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে—যেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
১৯৮৩ সালে City University of New York (CUNY) থেকে পিএইচডি শেষ হয়; গবেষণার বিষয় ছিল লেজার প্রযুক্তি। লেজার—সহজ কথায়—এমন এক ধরনের আলো, যা খুব সোজাসুজি পথে যায়, খুব শক্তিশালী হতে পারে, এবং খুব সূক্ষ্ম কাজেও ব্যবহার করা যায়। যেমন, চিকিৎসায় চোখের অপারেশন, শিল্পকারখানায় ধাতু কাটাকাটি, বা আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ফাইবার অপটিক—সবখানেই লেজারের ব্যবহার আছে। একই সময়ে তিনি Electrical Engineering-এও আরেকটি ডিগ্রি করেন—বিশেষত টেলিযোগাযোগ (Telecommunications)কে সামনে রেখে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের এই “দুই হাতে” দখলই পরে তাঁর কাজের শক্ত ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
পিএইচডির পর কিছু সময় তিনি Brooklyn Polytechnic University-তে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালেই তাঁর কর্মজীবনের বড় বাঁক আসে—AT&T Bell Laboratories-এ যোগদান।
বেল ল্যাবস: যেখানে প্রতিদিন ছয়টি পেটেন্ট—আর উদ্ভাবনকে বাজারে নামানোর “কলা”
বেল ল্যাবস—বিশ্ব প্রযুক্তি ইতিহাসে এক কিংবদন্তি নাম। ড. আউয়াল সেখানে কাজ করেছেন একাধিক স্তরে—শুধু গবেষণাগারের ভেতরে নয়, শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর (Technology Transfer), এবং সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পরিসরে।
শুরুর কাজ ছিল Opto-electronic integrated circuit নিয়ে—যেখানে আলো (optics) আর ইলেকট্রনিক্সকে একই চিপ বা সার্কিটে একত্র করা হয়। আমরা যেমন বিদ্যুৎ দিয়ে তথ্য চালাই, তেমনি আলো দিয়ে তথ্য আরও দ্রুত বহন করা যায়—ফাইবার অপটিকের মূল ধারণাও সেখানেই। তিনি সেমিকন্ডাক্টর মেটেরিয়াল প্রসেসিং থেকে শুরু করে ডিভাইস ফ্যাব্রিকেশন, টেস্টিং—সব পর্যায়েই কাজ করেন। সেই কাজের ফল হিসেবে তাঁর একটি পেটেন্টও হয়—বিশেষ করে কীভাবে III-V সেমিকন্ডাক্টর (থ্রি-ফাইভ সেমিকন্ডাক্টর)কে সিলিকনের সাথে একত্র করা যায়। সহজভাবে বললে: আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের “রুটি-রুজি” হলো সিলিকন; কিন্তু আলো-ভিত্তিক অনেক দ্রুত কাজের জন্য অন্য ধরনের সেমিকন্ডাক্টর দরকার হয়। দুই জগতকে এক করলে প্রযুক্তি আরও শক্তিশালী হয়—এটাই সেই উদ্ভাবনের সারকথা।
পরবর্তীতে তিনি AT&T–এর বিশাল টেলিকম অবকাঠামোর ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস টেকনোলজি নিয়ে কাজ করেন—সুইচিং সিস্টেম, ট্রান্সমিশন সিস্টেম ইত্যাদি কীভাবে উৎপাদনে যায়, কীভাবে মান বজায় রেখে বড় পরিসরে তৈরি হয়। এরপর তিনি যুক্ত হন টেকনোলজি ট্রান্সফার-এ—যেখানে বেল ল্যাবসের গবেষণাকে AT&T–এর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২৮টি ফ্যাক্টরি লোকেশনে বাস্তবে কাজে লাগানো হতো।
এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে “শিক্ষণীয়” অংশ হিসেবে তিনি বলেন বেল ল্যাবসের উদ্ভাবনী সংস্কৃতির কথা—সেখানে প্রতিদিন প্রায় ছয়টি পেটেন্ট, অর্থাৎ বছরে ১৬০০–১৭০০ পেটেন্টের মতো হয়। কিন্তু পেটেন্ট মানেই লাভ নয়। লাভ আসে তখনই, যখন গবেষণার ফলকে বাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলানো যায়—যখন উদ্ভাবনকে পণ্য ও সেবায় দ্রুত রূপান্তর করা যায়। ড. আউয়াল এই জায়গাটিকে বলেন Technology Management—প্রযুক্তি, বাজার, এবং ব্যবসার লক্ষ্যকে একই সুতোয় গাঁথার দক্ষতা।
তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে তিনি বেল ল্যাবসের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে বেসিক ও অ্যাপ্লাইড রিসার্চের আইডিয়া সংগ্রহ করতেন, আবার Verizon বা Sprint-এর মতো বড় ক্রেতাদের ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বুঝে প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতেন—কোন উদ্ভাবনটা প্রোডাক্টে যাবে, কোনটা যাবে না। তার ভাষায়, জ্ঞানকে প্রোডাক্টে অনুবাদ করা এবং সেখান থেকে কোম্পানির জন্য লাভ তৈরি করা—এটাই টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট।
৩জি ওয়্যারলেস: কেবল ভয়েস নয়, ডেটার যুগের দরজা
বেল ল্যাবসে কাজের আরেকটি বড় অধ্যায় ছিল Third Generation (3G) Wireless Technology। তখন 2G প্রায় শেষ; ভয়েস কলের বাজার স্যাচুরেটেড। নতুন প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার ছিল “ডেটা”—যেখানে মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার যন্ত্র নয়, বরং ইন্টারনেট, সার্ভিস, এবং ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম।
ড. আউয়াল ব্যাখ্যা করেন—GSM/CDMA-এর মতো প্রযুক্তিতে ডেটা গতি ও ব্যান্ডউইথ সীমিত ছিল। ৩জি এবং পরবর্তী প্রজন্মে লক্ষ্য ছিল উচ্চ ব্যান্ডউইথ, দ্রুত ডেটা সেবা। তিনি কাজ করেছেন কীভাবে মোবাইল থাকা অবস্থায় ল্যান্ডলাইনের মতো নানা সার্ভিস পাওয়া যায়, কী ধরনের রেডিও ডেটা সার্ভিস তৈরি করলে বাজারে তা গ্রহণযোগ্য হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এগুলো থেকে অপারেটররা কীভাবে আয় করবে। অর্থাৎ প্রযুক্তির সাথে ব্যবসার বাস্তব অংকও ছিল তাঁর কাজের অংশ।
দেশে ফেরার আগে: উদ্ভাবনের গল্প নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিটিটিবি পর্যন্ত
বেল ল্যাবসে কাজ করলেও ড. আউয়াল দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করেননি। তিনি প্রায় প্রতি বছর দেশে যেতেন—আর বেল ল্যাবসের নানা গবেষণার ফলাফল, উদ্ভাবনের ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠানে উপস্থাপনা দিতেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পোস্টগ্র্যাজুয়েট সেন্টার, বিটিটিবি (তৎকালীন টেলিযোগাযোগ সংস্থা) ইত্যাদিতে। তাঁর লক্ষ্য ছিল মূলত “মোটিভেট” করা—বিশেষ করে যারা নীতিনির্ধারণী স্তরে আছেন, তাদেরকে প্রযুক্তির সম্ভাবনা বোঝানো।
এই যাতায়াতই একসময় তাঁকে এমন এক বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি করে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের পথ বদলে দেয়।
সাবমেরিন কেবল: “৯৬০ কোটি টাকার ভুল সিদ্ধান্ত” থেকে বাঁচার গল্প
২০০১ সালের শুরুতে বাংলাদেশ যখন সাবমেরিন কেবল সংযোগের পথে এগোচ্ছে, তখন বিটিটিবি’র চেয়ারম্যান ড. আউয়ালের সহায়তা চান—সিংটেল (Singtel)–এর সাথে একটি সাবমেরিন কেবল চুক্তি হতে যাচ্ছিল। চুক্তির খসড়া দেখতে গিয়ে ড. আউয়াল বুঝতে পারেন—এই চুক্তি হলে বাংলাদেশ হবে “বিরাট লুজার”।
চুক্তির কাঠামো ছিল এমন: প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে “পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট” কানেকশন—সবকিছু করবে সিংটেল, টাকা দেবে বাংলাদেশ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ, বিলিং সিস্টেম, নেটওয়ার্ক অপারেশন—এসবের বাস্তব ক্ষমতা বাংলাদেশ পেত না; উপরন্তু “অনওয়ার্ড কানেক্টিভিটি” (অর্থাৎ সিঙ্গাপুর থেকে যুক্তরাষ্ট্র/জাপানসহ অন্য গন্তব্যে ডেটা যাওয়ার খরচ) বাংলাদেশকে বহন করতে হতো। এমনকি কেবলের মালিকানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশও থাকত অন্যপক্ষের হাতে। তিনি বিষয়টি বোঝানোর পর বিটিটিবি টিম সরকারকে বুঝিয়ে সেই চুক্তি বাতিল করে।
ড. আউয়াল এটিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে দেখেন—আর নিজের ভূমিকার কথা বলেন খুব সংযতভাবে: “এটুকু হয়তো আমার একটু সাহায্য হইছে।”
২০০১ সালে দেশে ফেরা: সুযোগ, দায়িত্ব, আর পরিবার-দর্শন
এই অভিজ্ঞতার পরই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। কারণ হিসেবে তিনি দুটি বিষয় উল্লেখ করেন—এক, দেশে বাস্তব অবদান রাখার সুযোগ এসেছে; দুই, সন্তানদের তিনি মুসলিম পরিবেশে বড় করতে চেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, সন্তানরা কোরআনে হাফেজ—কেউ আমেরিকায়, কেউ বাংলাদেশে থেকেও—এটা পরিবার হিসেবে তাঁদের একটি পথচলা।
সাবমেরিন কেবল নিয়ে আশাবাদ—আর শর্ত: পরিচালনায় দক্ষতা ও “নিউট্রাল” অপারেশন
সাবমেরিন কেবলের উদ্বোধন হয় ২১ মে ২০০৬—ড. আউয়াল নিজে উপস্থিত ছিলেন; এমনকি সংবাদমাধ্যমকেও কেবল “হাতে ধরে” দেখিয়ে বোঝানোর কথা বলেন। তিনি হিসাব দেন প্রকল্প ব্যয়ের—মূল প্রকল্প, লোকাল খরচ, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সমুদ্র পর্যন্ত ফাইবার লিংক—সব মিলিয়ে মোট ব্যয় কয়েকশ কোটি টাকা।
কিন্তু তাঁর আশাবাদ “শর্তযুক্ত”। তিনি মনে করেন, সাবমেরিন কেবল থেকে দেশের প্রকৃত লাভ আসবে তখনই, যখন এটিকে পরিচালনা করবে আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ কোনো অপারেটর—যারা কেবল কাটলে দ্রুত মেরামত করবে, আন্তর্জাতিক রুট ও উচ্চ ব্যান্ডউইথের চাহিদা সামলাবে, এবং “নিউট্রাল”ভাবে সব অপারেটরকে সমান সুযোগ দেবে। তিনি প্রস্তাব করেন রেভিনিউ শেয়ারিং ভিত্তিতে (যেমন ৫%/৬%/১০%) আন্তর্জাতিক অপারেটরকে অপারেশন দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে—মালিকানা থাকবে সরকারের, কিন্তু পরিচালনা হবে দক্ষ হাতে।
তিনি বর্তমান বাস্তবতার কথাও বলেন—সরকারি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক কমিউনিকেশন থাকায় প্রাইভেট অপারেটরদের অনাস্থা তৈরি হয়; ফলে অনেক আন্তর্জাতিক যোগাযোগ VoIP বা V-SAT–এর মতো বিকল্প পথে যাচ্ছে, যা তখন পুরোপুরি বৈধ কাঠামোর মধ্যে ছিল না। তাঁর যুক্তি পরিষ্কার: সরকার যদি কেবলকে “ওপেন” করে দেয়, তাহলে কল সেন্টার, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, কোলাবোরেটিভ ডিজাইনের মতো খাতগুলো দ্রুত দেশে আসতে পারে—আর তাতে সরকার ব্যান্ডউইথ লিজ দিয়েই বেশি আয় করতে পারে।
তবে সমস্যা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস—সরকার মনে করে বেসরকারি হাতে দিলে রাজস্ব হারাবে; বেসরকারি মনে করে সরকারের হাতে থাকলে দক্ষ ব্যবস্থাপনা হবে না। ড. আউয়াল মনে করেন এই ভুল বোঝাবুঝি কাটাতে না পারলে আইসিটি উন্নয়নও আটকে যাবে।
“ক্যারিয়ারস ক্যারিয়ার” ধারণা: ছোট দেশে ২০টি ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক কেন বিপজ্জনক
টেলিকম বাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে তিনি দেখেন—এক অপারেটরের সাথে অন্য অপারেটরের সম্পর্কের টানাপোড়েন। ফলে সবাই আলাদা আলাদা ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক বানায়—গ্রামীণ, বিটিটিবি, সিটিসেল/অ্যাকটেল/ওয়ারিদ/বাংলালিংক—সবাই নিজেদের মতো করে। ছোট দেশে এতগুলো সমান্তরাল নেটওয়ার্ক মানে খরচ বাড়া—শেষ পর্যন্ত সেই খরচ গিয়ে পড়ে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
এখানে তিনি একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংক তুলে ধরেন: যদি দেশে ২০টি অপারেটর থাকে, সবাই সবার সাথে আলাদা চুক্তি করলে প্রয়োজন হবে ১৯০টিরও বেশি ইন্টারকানেকশন এগ্রিমেন্ট—যা পরিচালনায় জটিল, ঝগড়ায় ভরা, এবং অদক্ষ। তিনি প্রস্তাব করেন—একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার “Carrier’s Carrier” হিসেবে ব্যাকবোন ইন্টারকানেকশন ম্যানেজ করুক। তাহলে প্রত্যেকে শুধু সেই এক অপারেটরের সাথেই চুক্তি করবে—ব্যাকবোনের জটিলতা কমবে, সেবা ঠিক হবে, খরচও কমবে।
রেগুলেটরি কমিশন: জ্ঞান ছাড়া নিয়ন্ত্রণ—আর বেতনের বাস্তবতা
ড. আউয়ালের সবচেয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ আসে রেগুলেটরি কমিশন নিয়ে। ২০০১ সালের টেলিকম নীতি ও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁর বক্তব্য—রেগুলেটর সফল হতে হলে উচ্চতর টেকনিক্যাল জ্ঞান, স্পেকট্রাম বোঝা, নেটওয়ার্ক বোঝা, ফেয়ার প্লেগ্রাউন্ড তৈরি—সবই প্রয়োজন। কিন্তু কমিশনাররা যদি টেকনিক্যাল না হন, আর যদি সরকারি স্কেলে কম বেতনে বসেন—তাহলে তারা সহজেই প্রভাবিত হতে পারেন, আর বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের মতো করে বিদেশফেরত অভিজ্ঞ টেকনিক্যাল লোকদের উচ্চ বেতনে নিয়োগ দিলে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব সঠিকভাবে আদায় করতে পারত—ভ্যাট, ট্যাক্স, স্পেকট্রাম অকশন, রেভিনিউ শেয়ারিং—সবই।
এই অংশে তাঁর বক্তব্যের ভেতরে একটি বড় নীতি-চিন্তা আছে: রাষ্ট্রের “দক্ষতা” যদি কম হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ক্ষতি শুধু প্রশাসনিক নয়—অর্থনৈতিকও।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও “প্রুফ অব কনসেপ্ট” কৌশল: ছাত্রদের দিয়ে রাষ্ট্রের সমস্যার প্রোটোটাইপ
বাংলাদেশে ফিরে তিনি কোথায় অবদান রাখলে সর্বোচ্চ প্রভাব হবে—তা খুঁজতে শুরু করেন। রাজনীতির ভূমিকা স্বীকার করেই তিনি বলেন, সবচেয়ে দরকার দেশপ্রেমিক ও সৎ নেতৃত্ব। কিন্তু একইসাথে তিনি দেখেন প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, পরিচয় সংকট, পাসপোর্ট জালিয়াতি, জমি নিয়ে মামলা, ট্যাক্স ব্যবস্থার দুর্বলতা—এসব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি যুক্ত হন North South University-তে। সেখানে ছাত্রদের বিএসসি থিসিস/ফাইনাল ইয়ার প্রজেক্টকে ব্যবহার করেন “প্রুফ অব কনসেপ্ট” হিসেবে—মানে, আগে ছোট আকারে কাজ করে দেখানো যে কাজটি সম্ভব। এরপর সেটি নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা।
১) ফিঙ্গারপ্রিন্ট-ভিত্তিক জাতীয় পরিচয়পত্র
তিনি ছাত্রদের দিয়ে একটি প্রোটোটাইপ বানান—ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে পরিচয় যাচাই। যুক্তিটি খুব সহজ: নাম বদলানো যায়, ঠিকানা বদলানো যায়, ছবি বদলানো যায়—কিন্তু আঙুলের ছাপ বদলানো কঠিন। ফলে একজনকে দুইবার “নতুন মানুষ” বানানো যাবে না। তিনি তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তা দেখান; মন্ত্রী উৎসাহী হন; পরে কমিটি, বিদেশে পরিদর্শন, জাতীয় কনসালট্যান্ট—এভাবে প্রকল্প এগোয়। ড. আউয়াল উল্লেখ করেন—এটি পরে বড় অঙ্কের প্রকল্পে রূপ নেয়; লক্ষ্য বিশাল জনসংখ্যাকে পরিচয়ের আওতায় আনা, যেখানে চিপসহ তথ্য থাকবে।
এই পরিচয়ব্যবস্থা থাকলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিয়ে-শাদি, পাসপোর্ট, সীমান্ত পারাপার, সম্পত্তি কেনাবেচা—সব ক্ষেত্রে “আমি কার সাথে ডিল করছি”—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
২) মেশিন রিডেবল/ডিজিটাল পাসপোর্ট
পাসপোর্টের ডিরেক্টর জেনারেলের উৎসাহে তিনি ছাত্রদের দিয়ে Machine Readable Passport-এর প্রোটোটাইপও করেন—যাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে সামঞ্জস্য থাকে।
৩) ভূমি কম্পিউটারাইজেশন ও জিআইএস
বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত মামলা ও প্রতারণা দীর্ঘদিনের ক্ষত। তিনি বলেন, দেশে ১৫ লাখ মামলা জমি নিয়ে—মালিকানা, দ্বিগুণ বিক্রি, ডুপ্লিকেট দলিল—সব মিলে বিশাল সামাজিক-অর্থনৈতিক জটিলতা। এই জায়গায় তিনি ও তাঁর দল তিনটি মৌজায় পাইলট করেন—ডেমরা, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ এলাকায়—যেখানে দাগ নম্বর, ডিজিটাল নথি, এবং GIS ম্যাপ (মানচিত্রভিত্তিক তথ্য) দিয়ে জমিকে শনাক্ত করা হয়। পরে সরকার বড় প্রকল্প হাতে নেয়—এটিও তিনি উল্লেখ করেন, যদিও বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতার কথাও বলেন।
৪) ট্যাক্স ও ভ্যাট: হয়রানি কমিয়ে স্বচ্ছতা
ট্যাক্স সংগ্রহ দুর্বল—এ কথা তিনি স্পষ্ট বলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, বাজেটের বড় অংশ কাস্টমস ডিউটির ওপর নির্ভরশীল; কিন্তু ব্যক্তিগত আয়কর, বড় করদাতা—এখানে ডেটাবেস দুর্বল। তিনি প্রস্তাব করেন—ট্যাক্সকে কম্পিউটারাইজ করে নাগরিককে পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেওয়া: “আপনার আয় এই, খরচ এই, ডিডাকশন এই, ট্যাক্স এই”—তাহলে তর্ক কমবে, হয়রানি কমবে, অনিয়মের পথ বন্ধ হবে। তিনি এনবিআর চেয়ারম্যানের সততা ও আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন, তবে একই সাথে বলেন—আমাদের শতবর্ষ পুরোনো ব্যুরোক্রেটিক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া পরিবর্তন না হলে অগ্রগতি ধীর হবে।
৫) পুলিশ, র্যাব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিচয়-নিশ্চয়তা
তিনি দেখেন মানুষ পুলিশে যেতে চায় না—ঘুষ, রেকর্ড বদল, পরিচয় যাচাই—সবই সমস্যা। তিনি ছাত্রদের দিয়ে থানার পুলিশ অফিসারদের সাথে কাজ করিয়ে একটি আইডেন্টিটি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির ধারণা এগিয়ে নেন—যেখানে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা ও তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে—এমন একটি নেটওয়ার্কড ওয়্যারলেস ধারণা তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুলিশ দেশীয় বাজেট ও বাইরের সহায়তায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক থানাকে কম্পিউটারাইজ করার পরিকল্পনায় এগিয়েছে।
৬) আইসিটি টাস্ক ফোর্স ও বহু মন্ত্রণালয়ের প্রোটোটাইপ
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন আইসিটি টাস্ক ফোর্সের অধীনে সহায়ক ইউনিট, প্রকল্প পরিচালক, এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ২৫–৩০টির মতো কনসেপ্ট প্রোটোটাইপ—ইন্টারঅ্যাক্টিভ ওয়েবসাইট, বিলিং সিস্টেম, স্কুল ডেটাবেস, র্যাবের নেটওয়ার্ক—এসব উদ্যোগে তিনি পরামর্শক/কমিটি সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
এখানে তাঁর কাজের ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ: তিনি “সবকিছু নিজে” করতে চাননি; বরং ছাত্র, কর্মকর্তা, উন্নয়ন অংশীদার—সবাইকে এক জায়গায় এনে “কাজটা সম্ভব”—এটা দেখিয়ে দিয়েছেন।
“আউটসোর্সিং” ও দক্ষ জনবল: ই-গভর্ন্যান্সের কঠিন বাস্তবতা
ড. আউয়াল বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ট্যাক্স—এসব চালাতে লাগে অত্যন্ত দক্ষ ও উচ্চ বেতনের টেকনিক্যাল টিম। কিন্তু সরকারি বেতনে এমন লোক রাখা কঠিন। তাই তিনি প্রস্তাব করেন—রাষ্ট্র চাইলে কিছু নাগরিক সেবা আউটসোর্স করতে পারে; নাগরিক সামান্য ফি দেবে, রাষ্ট্র সেই ফি দিয়ে পেশাদার টিমকে দায়িত্ব দেবে—যারা রাষ্ট্রের পূর্ণ কর্তৃত্বে কাজ করবে, কিন্তু দক্ষতায় হবে আধুনিক। তাঁর যুক্তি—এভাবে সেবা দ্রুত হবে, এবং জবাবদিহিও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন—প্রযুক্তির আগমনে অনেকের “ক্ষমতা” কমে যায়; কাগজের ফাইল, দালাল-ব্যবস্থা, দেরির সুবিধা—এসব হারিয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধ আসে। তাই কেবল প্রযুক্তি আনলেই হবে না—মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে, কম্পিউটার শিক্ষা বাড়াতে হবে, এবং প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা বদলাতে হবে।
বিসিএস পরীক্ষা: “আড়াই বছর” থেকে “চার-ছয় মাসে” আনার স্বপ্ন
ড. আউয়ালের আলোচনা থেকে উঠে আসে বিসিএস পরীক্ষার আরেকটি বড় সমস্যা—দীর্ঘসূত্রতা। বছরে ৪–৫ হাজার নিয়োগ হলেও প্রক্রিয়া টেনে চলে; প্রিলিমিনারি, রিটেন, ইন্টারভিউ, পোস্টিং—প্রতিটি ধাপের ব্যবধানে ভালো প্রার্থীরা চাকরি নিয়ে অন্যদিকে চলে যায়; আবার রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও থাকে।
তিনি প্রস্তাব করেন—প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বল্প সময়ের মধ্যে আনা: দ্রুত এমসিকিউ, সংক্ষিপ্ত লিখিত অংশ, লজিক্যাল/অ্যানালিটিক্যাল মূল্যায়ন, OCR ও অনলাইন রেজাল্ট—এভাবে চার-ছয় মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারকের মান উন্নত করতে হলে নিয়োগের প্রক্রিয়াও আধুনিক হতে হবে—কারণ এই প্রশাসনই দেশের চালিকাশক্তি।
উন্নয়ন অংশীদারদের “কৌশলগত সমস্যা” ও তিন পক্ষের বিচ্ছিন্নতা
তিনি একটি বড় কাঠামোগত সমস্যার কথা বলেন—উন্নয়ন অংশীদাররা (World Bank, UNDP, DFID, USAID ইত্যাদি) অনেক সময় সমন্বয়ের বদলে প্রতিযোগিতা করে; আর সরকারেরও একটি “মাস্টার প্ল্যান” না থাকায় কোন অংশ কে নেবে তা ঠিক হয় না। ফলে কাজের মাঝে “কেওস” তৈরি হয়।
এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন আরেকটি গভীর বিষয়—একাডেমি, ইন্ডাস্ট্রি, এবং সরকার—এই তিন পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা, শিল্পের বাস্তব চাহিদা, এবং সরকারের ক্ষমতা—এই তিনটি একসাথে কাজ না করলে বড় পরিবর্তন আসবে না। তিনি আক্ষেপ করেন, কম্পিউটার সায়েন্সে আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সংকেতও তখন দেখা যাচ্ছিল—কারণ সঠিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের অভাব।
আবার আমেরিকা: এক মাসের সফর, কিন্তু লক্ষ্য বাংলাদেশ—“নলেজ ব্রিজ” তৈরি
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে ড. আউয়াল বলেন—তিনি এক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন নর্থ সাউথের সামার ছুটিতে। উদ্দেশ্য একটাই: পুরোনো সহকর্মী, বন্ধু, বেল ল্যাবস/AT&T/IBM–এর পরিচিতজন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্স-ক্যাডেট ফ্যাকাল্টিদের সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের ছাত্রদের জন্য গবেষণা ও প্রজেক্ট সংযোগ তৈরি করা।
তিনি উদাহরণ দেন—কেউ MIS নিয়ে কাজ করছে, কেউ নেক্সট জেনারেশন ট্রান্সমিশন সিস্টেম, কেউ জুডিশিয়াল রেকর্ড ডিজিটাইজেশন, কেউ ই-৯১১ নিরাপত্তা ব্যবস্থা—এসবের সঙ্গে বাংলাদেশের থিসিস বা প্রকল্পকে মিলিয়ে দিলে ছাত্ররা বাস্তব এক্সপোজার পাবে। তাঁর লক্ষ্য—এমন একটি “ব্রিজ” হওয়া, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জ্ঞান দেশের তরুণদের কাছে পৌঁছায়।
তিনি বলেন, বিদেশে থাকা অনেক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী-প্রকৌশলী আনন্দ পান যদি তাদের জ্ঞান দেশের কাজে লাগে। এই আনন্দকে একটি কাঠামো দিলে বড় পরিসরে knowledge exchange forum গড়ে উঠতে পারে।
“৫০০ প্রোগ্রামার” বনাম “১৮ লাখ শ্রমিক”: উচ্চমূল্য অর্থনীতির দিকে যাওয়ার তাগিদ
ড. আউয়ালের বক্তব্যে এক জায়গায় আসে শক্তিশালী তুলনা—তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাতে বিপুল শ্রম আছে, কিন্তু আমরা মূলত কাটিং-মেকিং-ট্রিমিং পর্যায়ে আটকে; “ডিজাইন” ও উচ্চমূল্য যুক্ত অংশে কম। তিনি যুক্তি দেন, সাবমেরিন কেবল ও আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকলে কোলাবোরেটিভ ডিজাইন, দ্রুত প্রোটোটাইপ, নিউ ইয়র্কের স্টোর থেকে ফিডব্যাক—এসব নিয়ে উচ্চদামের বাজারে ঢোকা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন—দেশের জিডিপি বাড়াতে হলে, মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারদের কাজে লাগাতে হলে High Value–তে যেতে হবে; আর তা প্রযুক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি উদাহরণ দেন—দেশে ফিরে কেউ VLSI টেস্টিং নিয়ে কাজ করছে, তাইওয়ানের সাথে যুক্ত হয়ে মূল্য তৈরি করছে—এগুলোই ভবিষ্যৎ দিকচিহ্ন।
তরুণদের জন্য তাঁর বার্তা: নিরুৎসাহিত না হওয়া, দেশের প্রয়োজন বোঝা, আর “একজন মানুষও দুনিয়া বদলাতে পারে”
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে ড. আব্দুল আউয়াল তরুণদের উদ্দেশে খুব সরাসরি কথা বলেন। দেশে সমস্যা আছে—ঘুষ, নেতৃত্বের দুর্বলতা, সিস্টেমের জটিলতা—এসব দেখে যেন কেউ নিরুৎসাহিত না হয়। তাঁর বিশ্বাস, একজন মানুষও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তিনি ধর্মীয় উদাহরণ টেনে বলেন, অসম্ভব কিছু নেই—যদি আল্লাহ কবুল করেন, রাস্তা এমনভাবে খুলে যায় যা কল্পনাতেও আসে না।
তিনি বলেন, বড় ধনী হওয়াই সুখের একমাত্র শর্ত নয়; কিন্তু মানুষকে “সাব-পোভার্টি” স্তর থেকে তুলে এনে একটু স্বস্তির জায়গায় নেওয়া জরুরি। আর সেই কাজে নিজেকে “আমি আমার জন্য নয়—মানুষের জন্য” অবস্থানে রাখতে পারলে তাতে জীবনের অর্থ বাড়ে।
তিনি যোগাযোগেরও দরজা খোলা রাখেন—টেলিফোন ও ইমেইলে তরুণরা যোগাযোগ করলে তিনি সময় নিয়ে উত্তর দেবেন, বা কাউকে দিয়ে ফিরতি যোগাযোগ করাবেন—যাতে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করা যায়।
শেষ কথা: এক জীবনের পাঠ—দেশকে ভালোবাসা মানে “সমাধানের ভাষা” শেখা
ড. আব্দুল আউয়ালের জীবনকথা শুধু একজন সফল বিজ্ঞানীর গল্প নয়; এটি একটি দর্শনের গল্প—যেখানে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সাফল্য হিসেবে দেখা হয় না, বরং রাষ্ট্রের সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা হয়। বেল ল্যাবসের প্রতিদিনের পেটেন্ট-সংস্কৃতি থেকে তিনি শিখেছেন বাজার-বাস্তবতা; আর বাংলাদেশে ফিরে তিনি শিখেছেন প্রশাসনিক জটিলতা ও মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি। এই দুই অভিজ্ঞতা মিলেই তিনি বারবার বলেছেন—প্রযুক্তি দিয়ে কেবল “কাজ” নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হয়; কেবল “সিস্টেম” নয়, স্বচ্ছতা তৈরি করতে হয়।
আজ বাংলাদেশ যখন নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের দিকে তাকিয়ে আছে—ড. আউয়ালের এই পথচলা একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা: বিদেশে জ্ঞান অর্জন গৌরবের, কিন্তু সেই জ্ঞানকে দেশের মাটিতে মানুষের উপকারে লাগাতে পারলেই তা হয়ে ওঠে জাতীয় সম্পদ। আর এই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় বাহক হতে পারে বাংলাদেশের তরুণরা—যারা নিরুৎসাহিত না হয়ে, দেশের প্রয়োজনকে সামনে রেখে, ছোট ছোট প্রোটোটাইপ থেকে বড় পরিবর্তনের দিকে এগোবে।
সাক্ষাৎকারের তারিখ: ১৯ জুন ২০০৬ (৪৬ মিনিট)

Leave a comment