এক সময় বন গবেষণা মানেই ছিল গবেষকের কাঁধে নোটবুক, হাতে মিটারফিতা, দিনের পর দিন জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে গাছের উচ্চতা ও প্রজাতি নথিভুক্ত করা। এই মাঠভিত্তিক গবেষণা আজও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বন গবেষণার পদ্ধতি আমূল বদলে গেছে। ড. কাজী হোসেনের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইট ও ড্রোনভিত্তিক তথ্য যুক্ত হওয়ায় বন ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত আরও নির্ভরযোগ্য হয়েছে।
আগে কোনো এলাকার বনভূমির অবস্থা জানতে হলে দল বেঁধে সেখানে গিয়ে নমুনাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এতে সময় ও অর্থ ব্যয় হতো বেশি, আবার দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোও সব সময় সম্ভব হতো না। আধুনিক রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে বিশাল বনভূমির সামগ্রিক অবস্থা এক নজরে দেখা যায়। কোথায় বন ঘন, কোথায় ফাঁকা, কোথায় আগুন বা ঝড়ের প্রভাব পড়েছে—এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
ড্রোন প্রযুক্তি বন গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তুলনামূলকভাবে কম খরচে নির্দিষ্ট এলাকার উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তোলা যায়। এতে ছোট আকারের ক্ষয়ক্ষতি বা অবৈধ কাঠ আহরণের চিহ্নও ধরা পড়ে। লাইডার প্রযুক্তির মাধ্যমে বনের ত্রিমাত্রিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়—গাছের উচ্চতা, ছায়ার বিস্তার ও ঘনত্ব বিশ্লেষণ করা সহজ হয়। এই তথ্যগুলো মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আরও শক্ত হয়।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের ব্যাখ্যা। কাঁচা উপগ্রহচিত্র বা লাইডার ডেটা সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ নয়। এগুলোকে বিশ্লেষণ করে কার্যকর তথ্য বানাতে লাগে পরিসংখ্যান ও কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণ। ড. কাজী হোসেনের মতে, প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন গবেষকরা তার সীমাবদ্ধতা বুঝে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। প্রযুক্তি কোনো জাদুকাঠি নয়; এটি সিদ্ধান্তের সহায়ক মাত্র।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও সীমিত হলেও সম্ভাবনা বিপুল। সুন্দরবন বা পাহাড়ি বনভূমির মতো সংবেদনশীল এলাকায় রিমোট সেন্সিং ব্যবহার করে নিয়মিত নজরদারি করা গেলে অবৈধ কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এতে বন সংরক্ষণে প্রশাসনিক পদক্ষেপ আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি দুর্যোগের পর বনভূমির ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত মূল্যায়ন করে পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেওয়াও সহজ হয়।
ড. কাজী হোসেনের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ই ভবিষ্যতের বন গবেষণার পথ। প্রযুক্তি গবেষককে আরও দূর দেখার চোখ দেয়, আর মাঠের অভিজ্ঞতা প্রযুক্তিকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে। এই দুইয়ের সম্মিলনেই বন ব্যবস্থাপনায় টেকসই সিদ্ধান্ত সম্ভব।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment