জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পৃথিবীর বনভূমি আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বন উজাড়, অন্যদিকে দাবানল, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া—সব মিলিয়ে বন আজ আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ড. কাজী হোসেনের মতো গবেষকদের অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—বন ব্যবস্থাপনা কেবল কাঠ সংগ্রহের প্রশ্ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ড. কাজী হোসেনের মতে, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় এমন একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যেখানে বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণ করা হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় না। বনকে একটি জীবন্ত ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখতে হবে—যেখানে গাছের পাশাপাশি রয়েছে জীববৈচিত্র্য, জলসম্পদ ও মাটির স্বাস্থ্য। একটি বন যদি শুধু কাঠ উৎপাদনের লক্ষ্যেই ব্যবস্থাপিত হয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কানাডার মতো দেশে বনভূমির বড় অংশ সরকারি মালিকানাধীন। সেখানে কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাঠ আহরণের অনুমতি দেওয়া হয়। এই পরিকল্পনায় পরিবেশবিদ, জীববিজ্ঞানী ও পরিসংখ্যানবিদ একসঙ্গে কাজ করেন। আগুনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বন কীভাবে পুনর্জন্ম নেয়, কোন এলাকায় সংরক্ষণ বাড়ানো দরকার—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ও মডেলিংয়ের ভিত্তিতে। এতে বন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বন ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে, নতুন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এসব পরিবর্তন বনের স্বাভাবিক বৃদ্ধির ধারাকে ব্যাহত করে। ড. কাজী হোসেনের মতে, এই পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জরুরি। কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি, কোথায় পুনর্বনায়নের প্রয়োজন—এসব সিদ্ধান্ত নিতে হলে অতীত ও বর্তমান তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ দরকার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই বন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন আরও তীব্র। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এবং সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে বন সংরক্ষণ মানে শুধু গাছ রক্ষা করা নয়; এটি উপকূলীয় জনপদ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দুর্যোগঝুঁকি কমানোর সঙ্গেও যুক্ত।
ড. কাজী হোসেন মনে করেন, টেকসই বন ব্যবস্থাপনার সফলতা নির্ভর করে বিজ্ঞান, নীতি ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর। গবেষণালব্ধ তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ দুর্বল হয়, আবার সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনা টেকসই হয় না। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বনকে রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। এই উপলব্ধি যত দ্রুত আমাদের নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে, তত দ্রুত আমরা পরিবেশগত নিরাপত্তার পথে এগোতে পারব।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment