বয়সজনিত ব্রেইন অ্যাট্রোফি নিয়ে গবেষণা গত তিন দশকে নিউরোসায়েন্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। গড়পড়তা হিসেবে মানুষ ৬০ বছরের পর থেকে প্রতি দশকে মস্তিষ্কের মোট ভলিউমের ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারায়, যার বৃহৎ অংশই ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটারের ক্ষয়। বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাস এবং সেরিবেলামের যেসব অঞ্চল ওয়ার্কিং মেমরি, এক্সিকিউটিভ ফাংশন এবং অডিটরি প্রসেসিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত—সেগুলোতে অবনতি সবচেয়ে দ্রুত ঘটে। ৭০ বছরের পরে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবীণই বিভিন্ন মাত্রার কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট রিপোর্ট করেন।
এ প্রেক্ষাপটে “সুপার–এজারস” ধারণাটি নিউরোবার্ধক্য–গবেষণায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে। এদের ক্ষেত্রে দেখা যায়—সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই প্রবীণদের গ্রে ম্যাটার ক্ষয়ের হার অত্যন্ত কম, এবং তাদের স্মৃতি ও স্নায়বিক কার্যকারিতা তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের কাছাকাছি মাত্রায় বজায় থাকে। ফলে গবেষকরা আজ সক্রিয়ভাবে খুঁজছেন—কোন কোন পরিবেশগত বা আচরণগত কারণ এই সুরক্ষা প্রদান করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনধারা–ভিত্তিক হস্তক্ষেপের মধ্যে ব্যায়াম, পুষ্টি এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা সবচেয়ে আলোচিত ছিল। তবে ২০২৩ সালের একটি উচ্চমানের নিউরোইমেজিং গবেষণা নতুন আলো ফেলেছে এমন একটি আচরণে, যা তুলনামূলকভাবে সহজ, কম ব্যয়ী এবং সামাজিকভাবে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য—সক্রিয়ভাবে সঙ্গীত–শোনা।
ডেমিয়েন মেরি ও সহকর্মীদের পরিচালিত এই গবেষণায় (Neuroimage: Reports, ২০২৩) ৬২ থেকে ৭৮ বছর বয়সী ১৩২ জন সুস্থ প্রবীণকে ছয় মাস ধরে দুটি আলাদা সঙ্গীত–ভিত্তিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করানো হয়। একদলে ছিল বাদ্যযন্ত্র শেখা; অন্য দলে ছিল “মিউজিক অ্যাওয়ারনেস” প্রোগ্রাম, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ, রিদমিক প্যাটার্ন আলাদা করা, হারমনিক স্ট্রাকচার অনুধাবন এবং সঙ্গীতের আবেগীয় রূপ বোঝার অনুশীলন করেছেন।
ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উচ্চ-রেজোলিউশন স্ট্রাকচারাল এমআরআই বিশ্লেষণে দেখা যায়—দুই দলেই সেরিবেলামের বিশেষ অঞ্চল, বিশেষত ‘লবিউল VIII’-এ গ্রে ম্যাটার ভলিউম বৃদ্ধি পেয়েছে। বয়সজনিত অ্যাট্রোফির চলমান প্রবণতার বিপরীতে এই বৃদ্ধি পরিমাপযোগ্য এবং পরিসংখ্যানগতভাবে শক্তিশালী, যা নির্দেশ করে—সঙ্গীতভিত্তিক কগনিটিভ উদ্দীপনা নিউরাল প্লাস্টিসিটি সক্রিয় করতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের ওয়ার্কিং মেমরি স্কোরও ১২ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হয়।
এই ফলাফল নিউরোসায়েন্স সম্প্রদায়ের জন্য দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, এটি দেখায়—নিউরাল প্লাস্টিসিটি বার্ধক্যেও সক্রিয় থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, কগনিটিভ ইন্টারভেনশনের ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্র শেখা একমাত্র পথ নয়; সক্রিয় সঙ্গীত–শোনা—যেখানে শ্রোতা সুরের প্যাটার্ন ধরতে চেষ্টা করে, আবেগীয় সংকেত বোঝে, এবং সঙ্গীতের গঠনগত মাত্রাকে বিশ্লেষণ করে—তাও একই ধরনের মস্তিষ্ক–সংক্রান্ত পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
অন্যান্য গবেষণাও এই প্রবণতাকে সমর্থন করে। tDCS-ভিত্তিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সেরিবেলাম মডুলেশন প্রবীণদের এপিসোডিক মেমরি ৮–১৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত করতে পারে (GeroScience, ২০২৩)। আবার দীর্ঘমেয়াদি লংগিচ্যুডিনাল স্টাডিগুলো দেখায়—সাপ্তাহিক ৩–৪ দিন সঙ্গীত চর্চা বা সক্রিয় শ্রবণ ৩ গুণ কমায় বয়সজনিত কগনিটিভ অবনমন।
এসব গবেষণা আমাদের গবেষণা-কমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বার্তা দেয়।
প্রথমত, কগনিটিভ হেলথ সায়েন্সে সঙ্গীতভিত্তিক ইন্টারভেনশন নতুন নয়, কিন্তু নিউরোইমেজিং–প্রমাণিত কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিমাণ এতদিন এত স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। ফলে এটি ভবিষ্যতের ব্রেইন–হেলথ উদ্যোগে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, কম–ব্যয়ী ও সহজলভ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আমরা যারা গবেষণা করি, তাদের জন্য এটি ইঙ্গিত দেয়—মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কের কার্যক্ষমতা শুধুমাত্র জেনেটিক বা প্যাথোলজিক্যাল পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং পরিবেশগত কগনিটিভ চ্যালেঞ্জ, সেন্সরি ইনপুট এবং উচ্চমানের মনোযোগ–নিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডও তার ওপর টেকসই প্রভাব ফেলে।
তৃতীয়ত, এ ফলাফল বিভিন্ন শাখার গবেষকদের জন্য নতুন আন্তঃবিভাগীয় সুযোগ তৈরি করছে। নিউরোসায়েন্স, মিউজিক্যাল কগনিশন, জেরোন্টোলজি, ডিজিটাল হেলথ এবং আচরণবিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই এই লো–কস্ট ইন্টারভেনশনকে ইন্টিগ্রেট করা সম্ভব।
সবশেষে, ভবিষ্যৎ গবেষণা এখন জানতে চাইছে—সঙ্গীত কি শুধু সুস্থ প্রবীণদের ক্ষেত্রেই কার্যকর, নাকি মাইল্ড কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট (MCI) বা আলঝাইমার–ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতেও এর প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা আছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বড় স্যাম্পল–সাইজে, দীর্ঘমেয়াদি লংগিচ্যুডিনাল স্টাডির প্রয়োজন।
তবে বর্তমান প্রমাণ একথা খুব স্পষ্ট করে বলে—
সঙ্গীত শুধু সাংস্কৃতিক চর্চা নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নিউরোকগনিটিভ ইন্টারভেনশন।
এটি ব্রেইন অ্যাট্রোফির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার ধরে রাখতে পারে, এবং প্রবীণদের স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারে।
গবেষণা–কমিউনিটির কাছে এটি একটি অনন্য সুযোগ—সঙ্গীতকে কগনিটিভ হেলথ টুল হিসেবে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা, প্রয়োজনে জনস্বাস্থ্য নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা, এবং বয়স–সম্পর্কিত ব্রেইন ডিক্লাইনের বিরুদ্ধে নতুন প্রমাণ–ভিত্তিক হস্তক্ষেপ গড়ে তোলা।
বিজ্ঞান আজ আমাদের সামনে একটি পরিষ্কার ও শক্তিশালী সম্ভাবনা তুলে ধরছে—
সঠিক উদ্দীপনা পেলে মানব মস্তিষ্ক বৃদ্ধ বয়সেও নতুনভাবে বিকশিত হতে পারে। সঙ্গীত সেই উদ্দীপনার অন্যতম সহজ, নিরাপদ ও প্রমাণিত পথ।

Leave a comment