দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক সিদ্ধান্ত নিই অভিজ্ঞতা বা অনুমানের ওপর ভর করে। কোন পথে গেলে দ্রুত পৌঁছানো যাবে, কোন দোকানে ভালো জিনিস পাওয়া যায়—এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কাজে আসে। কিন্তু যখন বিষয়টি হয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন সিদ্ধান্ত, তখন অনুমাননির্ভরতা ভয়ংকর হতে পারে। ড. কাজী হোসেনের মতে, বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্য বা ডেটা।
বন মানে কেবল গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল জীবন্ত ব্যবস্থা। এখানে গাছের পাশাপাশি রয়েছে পাখি, প্রাণী, জলপ্রবাহ, মাটির গুণাগুণ এবং মানুষের জীবিকার প্রশ্ন। কোনো এলাকায় কতটুকু গাছ কাটা যাবে, কোথায় সংরক্ষণ বাড়ানো দরকার, কোথায় নতুন করে বনায়ন করা উচিত—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ওপর দিলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ে। ড. কাজী হোসেন বলেন, বন ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবেশ ও মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। তাই এই সিদ্ধান্তগুলো হওয়া দরকার তথ্যভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর।
তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সব জায়গায় গিয়ে প্রত্যেকটি গাছের মাপ নেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। সময়, অর্থ ও জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞানীরা নমুনাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ পুরো বনভূমির প্রতিনিধিত্ব করে এমন কিছু নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তথ্য নেওয়া হয়। এরপর পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরো এলাকার একটি ধারণা পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা বা ভুলের একটি সীমা থাকে। ড. কাজী হোসেনের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই অনিশ্চয়তার বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। কারণ কোনো তথ্য শতভাগ নির্ভুল না হলেও, সেটি অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
তিনি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বোঝাতে একটি সহজ উদাহরণ দেন। ধরুন, একজন চিকিৎসক রোগীর অবস্থা না দেখে ও পরীক্ষা ছাড়া ওষুধ দিয়ে দিলেন। এতে সাময়িকভাবে উপকার হতে পারে, আবার ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু রক্তপরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা দিলে ঝুঁকি কমে যায়। বন ব্যবস্থাপনায়ও একই যুক্তি প্রযোজ্য। তথ্য ছাড়া সিদ্ধান্ত মানে অন্ধভাবে এগোনো।
ড. কাজী হোসেন আরও বলেন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত কেবল গবেষণার জন্য নয়, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও জরুরি। সরকার যখন বন ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতি তৈরি করে, তখন গবেষণালব্ধ তথ্য ও বিশ্লেষণ সেই নীতিকে শক্ত ভিত্তি দেয়। এতে নীতি বাস্তবায়নের সময় পরিবেশগত ক্ষতি কম হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আরও বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার চাপ ও ভূমির সীমাবদ্ধতা আমাদের বনসম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা করলে অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। ড. কাজী হোসেনের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, তথ্যকে উপেক্ষা না করে বরং তথ্যের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই টেকসই ভবিষ্যতের পথে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বন ব্যবস্থাপনায় নয়, জীবনের নানা ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ব্যক্তি ও সমাজ—দুইই লাভবান হয়।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment