সাক্ষাৎকার

মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিশ্বস্বাস্থ্য: ড. শাফী ভূঁইয়ার পথিকৃৎ যাত্রা

Share
Share

ড. শাফী ভূঁইয়া একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ, যিনি শৈশবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হওয়ার মত বিপর্যয় থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য উন্নয়নে পথিকৃৎ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জীবনের কাহিনী একটি প্রেরণাদায়ক উদাহরণ – কীভাবে এক যুদ্ধাহত শিশুর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, উচ্চশিক্ষা আর নিষ্ঠা তাকে একজন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নেতা ও উদ্ভাবক হিসেবে গড়ে তুলেছে। সাধারণ পাঠক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শিক্ষণীয় যে দূরদৃষ্টি, কঠোর পরিশ্রম এবং সহযোগিতামূলক মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে যে কোনও বাধা অতিক্রম করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ড. ভূঁইয়ার গল্প আমাদের দেখায় যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই পরিবর্তন নিজের থেকেই শুরু করার সাহস ও ধৈর্য রাখতে হবে।

শৈশব ও মুক্তিযুদ্ধের আঘাত

ড. শাফী ভূঁইয়ার জন্ম এক গ্রামীণ পরিবেশে, যেখানে শৈশবেই তিনি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সাক্ষী হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। ভাগ্যক্রমে গ্রামেরই একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার তৎপরতায় তাঁর প্রাণরক্ষা হয়। এই ঘটনার কারণে ড. শাফী নিজেকে ‘দ্বিতীয় জীবন’ পাওয়া মানুষ বলে উল্লেখ করেন। যুদ্ধের সেই অভিজ্ঞতা ও চারপাশের সাহসী মানুষের গল্প শুনে বড় হতে হতে তাঁর মনের মধ্যে দেশপ্রেম আর মানবসেবার বীজ রোপিত হয়। শিশুকালের সেই আঘাত ও অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার স্মৃতি পরবর্তীতে সমাজের জন্য কিছু করার দৃঢ় সংকল্প হিসেবে তাঁর চিন্তাধারাকে গড়ে তোলে।

চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রতি ঝোঁক

শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা ও মানবসেবার ব্রত নিয়ে ড. শাফী ভূঁইয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস (চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রি) অর্জন করেন। একজন তরুণ চিকিৎসক হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সেবার মানসিকতা স্পষ্ট ছিল। সদ্য পাশ করার পর তিনি বাংলাদেশে প্রথম অ্যাজমা (হাঁপানি) সেন্টার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরপর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করে রোগী চিকিৎসা ও নবীন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে কাজ করার সময় গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর সূচনা অ্যানাস্থেসিয়া বিভাগে হলেও ড. শাফী দ্রুত উপলব্ধি করেন যে শুধু হাসপাতালে কয়েকজন রোগী দেখলে তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। ছোটবেলা থেকে লালন করা স্বপ্ন অনুসারে তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ড. শাফী ভাবতে লাগলেন, কীভাবে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা যায় যেখানে গ্রামের অসহায় মায়েরাও ক্ষমতায়িত হন এবং প্রতিটি শিশু সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে। কারণ তিনি নিজে একসময় মায়ের সেবা পেলেও তখনকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে তেমন সহায়তা পাননি; সেই অভাব পূরণ করতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। এই প্রেরণায় তিনি মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য কাজ করাকে জীবনের বড় লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেন।

চিকিৎসক থেকে গবেষক ও শিক্ষক: পেশার বদল

বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে ড. শাফী ভূঁইয়া বুঝতে পারেন, যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি দেখছেন তা বাস্তবায়নে প্রচলিত পথে অনেক বাধা রয়েছে। নিজের কর্মক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না দেখতে পেয়ে তিনি ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি দেশে-বিদেশে আরও পড়াশোনা ও গবেষণা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ফলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উপর স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি এবং পরে পিএইচডি করার পরিকল্পনা করেন।

ড. শাফী অনুভব করেন যে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করে সিস্টেম বদলানো যদি কঠিন হয়, তবে নতুন প্রজন্মের পেশাজীবীদের প্রস্তুত করা দরকার যারা ভবিষ্যতে এই পরিবর্তন সাধন করতে পারে। তিনি শিক্ষকতার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন (capacity building) এর পথ বেছে নেন। তাঁর দৃষ্টিতে, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক জ্ঞান দিয়ে গড়ে তুললেই কেবল সেটি পুনর্গঠন সম্ভব। কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী দেখিয়ে দিয়েছে যে শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। তাই এই খাতে উদ্ভাবন ও পুনর্গঠনের জন্য শিক্ষিত ও দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তোলা অপরিহার্য। ড. শাফী ভূঁইয়ার বিশ্বাস ছিল, যোগ্য ও সচেতন নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারলে তবেই মায়েদের ক্ষমতায়ন হবে, সুস্থ মা সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারবেন এবং পরবর্তী প্রজন্ম আরও সমৃদ্ধ হবে। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি চিকিৎসকের চেয়ে শিক্ষক ও গবেষকের ভূমিকায় নিজেকে অধিক কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাস্তবতার দাবি মেনে পেশার এই বদলে তিনি পিছপা হননি, বরং এটিকেই নিজের মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে উদ্যোগ ও অবদান

মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ড. শাফী ভূঁইয়ার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে, দেশে যেমন, তেমনি বিদেশেও। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি আজিমপুর মাতৃসদন হাসপাতাল আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। জাপান সরকারের সহায়তায় প্রায় ২৭০ শয্যার এই মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্রটির পুনর্নির্মাণে তিনি বাংলাদেশি লিয়াজোঁ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। ফলস্বরূপ আজিমপুর মাতৃসদন দেশের মাতৃসেবা খাতে এক উৎকৃষ্ট মডেল হিসাবে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গর্ভবতী মা ও নবজাতকের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ড. শাফী তাঁর স্বপ্নের একটি অংশ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন – এমন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র যা মায়েদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

ড. শাফী ভূঁইয়া দেশে হাঁপানি (অ্যাজমা) সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন, সবসময়ই সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্যমী থেকেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেছেন। বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই খাতে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছেন। কানাডা ও বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে তাঁর শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের মাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে পরোক্ষভাবে অবদান রেখে চলেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বহুসংখ্যক আন্তর্জাতিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যপেশাজীবীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যারা নিজ নিজ সম্প্রদায়ে মা ও শিশুর সেবায় ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি একটি “মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য হ্যান্ডবুক” ডিজিটাইজ করার আন্তর্জাতিক প্রকল্পেও জড়িত রয়েছেন, যাতে নানা দেশের সুস্থ মাতৃত্ব ও শৈশব-সেবা বিষয়ক জ্ঞান একত্রিত হয়। দেশের ভেতরে ও বাইরে এই সব উদ্যোগ ড. শাফীকে এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা ও নিষ্ঠা থাকলে সীমিত সম্পদেও স্বাস্থ্য খাতে টেকসই পরিবর্তন আনা যায়।

জাপানে পিএইচডি ও সামাজিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে পথচলা

আজিমপুর মাতৃসদনে ড. শাফী ভূঁইয়ার কাজ দেখে জাপানি বিশেষজ্ঞরা তাঁর মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন, বাংলাদেশের এই চিকিৎসক প্রযুক্তি বা নির্দিষ্ট রোগের চেয়ে মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিয়ে বেশি ভাবেন। ফলস্বরূপ জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় ড. শাফীকে তাদের ‘হিউম্যান সায়েন্স’ (মানববিজ্ঞান ও সামাজিক চিকিৎসাবিজ্ঞান) পিএইচডি প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। এই অনন্য পাঠক্রমে নৃবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্বেচ্ছাসেবা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় এক ছাতার নিচে পড়ানো হয় – এর মূল লক্ষ্য রোগ নিরাময় নয়, সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় ও অভিনব এই বিভাগে ড. শাফী ভুঁইয়া একজন পথিকৃৎ হয়ে যান; সেখানে তিনি এবং তাঁর তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ইয়াসুহিদা নাকামুরা ছিলেন হাতে গোনা মেডিক্যাল-ব্যাকগ্রাউন্ড গবেষকদের মধ্যে। বহুবিষয়ক সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হয় এবং গবেষণার গভীরতা বৃদ্ধি পায়। ওসাকাতে পিএইচডি অর্জনের অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন, যা তাঁর চিন্তাকে ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা থেকে সমাজের বৃহত্তর প্রয়োজনে কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করেছে।

পিএইচডি যাত্রার পূর্বে থাইল্যান্ডের মাহিডল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ) সম্পন্ন করেন, যেখানে নগর স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পান। মাহিডলে তাঁর এক অধ্যাপক (যিনি ভাগ্যক্রমে নিজেও একজন চিকিৎসক) ড. শাফীকে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে উৎসাহিত করেন। রোগ কেন হচ্ছে, কীভাবে প্রতিরোধ ও সমাধান করা যায় – এই “কেন” এবং “কীভাবে” প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার অভ্যাস ড. শাফীর ভেতর সেখানেই গড়ে ওঠে। ওই অধ্যাপক বিভিন্ন উদাহরণ ও উপায়ে তাঁকে বোঝান যে শুধুমাত্র রোগী দেখে গেলে চলবে না, সমস্যার মূল কারণ অন্বেষণ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাধান করতে হবে। এর ফলে ড. শাফী চিকিৎসক থেকে সমাজবিদ-গবেষক হয়ে ওঠার প্রেরণা পান। তিনি জানতেন এই পথচলা সহজ নয়, তবু পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতে তিনি পিছপা হননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল – “পরিবর্তন কঠিন হলেও, পরিবর্তনই উন্নয়নের পথ।” তিনি বলে থাকেন, অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই; ‘অসম্ভব’ শব্দটিও নিজের ভেতর বলে “আমি সম্ভব”। এই আশাবাদী দৃঢ়তা নিয়ে ড. ভূঁইয়া জাপানে পিএইচডির গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। নিজের ক্ষেত্রে তিনি এক প্রকার অগ্রগামী ছিলেন এবং এই সাহসিকতা তাঁর পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।

মাহিডল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও জাপানে পুনরাগমন

পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ড. ভূঁইয়া ভাবতে লাগলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত। গবেষণা চালিয়ে যাওয়া নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা – এই দুই ধারার ক্যারিয়ারের মধ্যে তিনি ভারসাম্য খুঁজছিলেন। ওসাকার অধ্যাপকরা তাঁকে পড়ানো ও গবেষণার নানা দায়িত্বে সম্পৃক্ত করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেন যে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেও জ্ঞান বিতরণের আনন্দ পাওয়া যায়। ড. শাফী দেশে ফেরারও চেষ্টা করেছিলেন; তবে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তাঁকে যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে জেলা পর্যায়ে একটি মেডিকেল অফিসারের পদ দিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেন। একজন পিএইচডি-ধারী সামাজিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীকে করিমগঞ্জে পোস্টিং দেওয়াকে তিনি নিজের স্বপ্নপূরণের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখলেন। তাই বাংলাদেশে ফিরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা তিনি暂时 স্থগিত রেখে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শিক্ষকতার সুযোগটি গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের নিকটবর্তী থাইল্যান্ডে অবস্থিত খ্যাতনামা মাহিডল বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনস্বাস্থ্য শিক্ষায় শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। ড. শাফী ভূঁইয়া সেখানে বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞ (Foreign Technical Expert) হিসাবে যোগ দেন। মাহিডলে তিনি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের পড়াতে শুরু করেন। এটাই ছিল ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পর তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক অধ্যাপনার পদ। প্রায় দুই বছর থাইল্যান্ডে শিক্ষাদান করার পর তিনি আরেকটি বিরল সম্মাননা লাভ করেন – জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্স (JSPS) এর পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ। ২০০৭ সালের দিকে অর্জিত এই ফেলোশিপের সুবাদে তিনি আবারও জাপানে “হোম কামিং” করলেন; ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক গবেষক ও অনুষদ সদস্য হিসেবে ফিরে গেলেন।

জাপানে দ্বিতীয় দফায় অবস্থানের শেষে পারিবারিক কারণে ড. ভূঁইয়া নতুন মহাদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একজন পারিবারিক মানুষ হিসেবে তিনি তাঁর সন্তানদেরশিক্ষা ও সুস্বাস্থ্যকে সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। পরিবারের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই তিনি জাপান ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমান।

কানাডায় অভিবাসন ও প্রারম্ভিক সংগ্রাম

নতুন দেশ কানাডায় পাড়ি দিয়ে ড. ভূঁইয়া পরিবারসহ একদম গোড়া থেকে শুরু করেন। উত্তর আমেরিকার বাস্তবতা হলো – বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত অভিবাসী চাকরি খুঁজতে আসে, কিন্তু তাদের মেধা অনুযায়ী কাজ পাওয়া যেন সোনার হরিণ। ড. শাফী ভূঁইয়া জানতেন যে কানাডায় তাঁর জন্য সঙ্গে সঙ্গে সম্মানজনক চাকরি পাওয়া সহজ হবে না এবং সেই বাস্তবতা তিনি মেনে নিয়েই এসেছিলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে তাঁর মেধার যথাযোগ্য মূল্যায়ন হয়নি বলে পরিবারটি স্থায়ীভাবে উত্তর আমেরিকাতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দেশত্যাগের এই ত্যাগ স্বীকার করে তিনি নতুন সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মনোনিবেশ করেন।

কানাডায় এসে শুরুর দিনগুলোতে ড. ভূঁইয়া প্রত্যক্ষ করেন যে পেশাগত নেটওয়ার্কিং (যোগাযোগ) কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিশ্বাস, “বন্ধু হচ্ছে জীবনের অমূল্য সম্পদ — ব্রিজ তৈরি কর, কখনও ব্রিজ ভেঙে দিও না।” তিনি তাঁর এক কানাডীয় সহকর্মীকে জানালেন যে তিনি দেশে এসে পৌঁছেছেন। ওই সহকর্মী পূর্বপরিচিত; ড. শাফী বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতেন, সেখান থেকে তাদের পরিচয় ছিল। তিনি ড. শাফীর কর্মদক্ষতার কথা মনে রেখেছিলেন এবং নিজের সংস্থায় বাজেট না থাকায় সরাসরি নিয়োগ দিতে না পারলেও আরেকজন নিয়োগকর্তার সন্ধান দিলেন। ড. শাফী তাঁর পরামর্শমতো দ্রুত জীবনবৃত্তান্ত (CV) পাঠালেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই একটি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে চাকরির প্রস্তাব পেলেন। আশ্চর্যজনকভাবে কানাডা আসার মাত্র ক’দিনের মধ্যে তিনি সিনিয়র ম্যানেজার ও বিজ্ঞানী (research manager & scientist) হিসেবে একটি স্বাস্থ্য-গবেষণা প্রকল্পে নিয়োগ লাভ করেন। যেখানে অন্য অভিবাসী পেশাজীবীদের অনেক সময় স্থানীয় যোগ্যতা অর্জন ও নানাবিধ বাধা পেরোতে হয়, সেখানে ড. শাফীর এই সাফল্য এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।

কানাডায় কর্মজীবনের শুরুতে ড. ভূঁইয়া দ্রুত নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেন। সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখতে থাকেন এবং নিজের শ্রদ্ধাশীল আচরণ, পরিশ্রম ও উদ্দীপনা দিয়ে সবার আস্থা অর্জন করেন। দুই বছরের মধ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যসংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি হয়ে যায়। এই সময় তাঁর তত্ত্বাবধায়ক একদিন পরামর্শ দিলেন যে ড. শাফী প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকের মশাল বহন করছেন – এত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নিয়ে তিনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, তবে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন। বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে তাঁর যে গভীর বিশেষজ্ঞত্ব রয়েছে, তা ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হবে। ওই তত্ত্বাবধায়ক ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর গ্লোবাল হেলথ বিভাগের ডীন ও অধ্যাপকদের সাথে ড. শাফীর পরিচয় করিয়ে দেন। এভাবেই শিল্পখাত থেকে একাডেমিয়ায় তাঁর মসৃণ রূপান্তর ঘটে, যা তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি বাঁকবদলের অধ্যায়।

অভিবাসী চিকিৎসকদের জন্য আইটিএমডি প্রোগ্রাম

কানাডায় একাডেমিক জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ড. ভূঁইয়া লক্ষ্য করলেন যে বহু অভিবাসী ডাক্তার, নার্সসহ বিভিন্ন বিদেশ-প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী সঠিক কর্ম-সুযোগের অভাবে হতাশায় ভুগছেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পারেন, উপযুক্ত দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ পেলে এদের মেধা কানাডার স্বাস্থ্যখাতে কাজে লাগানো সম্ভব। এই উপলব্ধি থেকে ২০১৩ সালে তিনি টরন্টোর রাইয়ারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি) তৎকালীন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেন। তাঁর প্রস্তাবে ২০১৪ সালে শুরু হয় “ইন্টারন্যাশনালি ট্রেইন্ড মেডিক্যাল ডক্টরস (ITMD) ব্রিজিং প্রোগ্রাম” – অভিবাসী চিকিৎসকদের মূলধারার স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ সেতুবন্ধন কোর্স।

এই প্রোগ্রামের কাঠামো তৈরি, পড়ানো ও সমন্বয় – সবকিছুতেই ড. ভূঁইয়া মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ব্রিজিং কোর্সটিতে বিদেশ থেকে আসা ডাক্তাররা কানাডার ব্যবস্থায় পুনরায় চিকিৎসা-লাইসেন্স পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প ক্যারিয়ারের পথও খুঁজে নিতে শুরু করেন। ড. ভূঁইয়া তিনটি প্রধান দক্ষতার উপর জোর দেন: গবেষণা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ ও নেতৃত্ব দক্ষতা। অত্যন্ত আন্তরিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই কোর্সটি অভিবাসী চিকিৎসকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০টি দেশের ৪৭৫ জনেরও বেশি চিকিৎসক এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হন। এটি এতই সফল হয় যে, আগে যেখানে অভিবাসী স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের মাত্র ৫% মুলধারার পেশায় সফল হতে পারতেন, সেখানে এই প্রোগ্রামের পর অনেকের জন্য নানামুখী সুযোগের দ্বার খুলেছে। ড. শাফীর হিসাব অনুযায়ী, তাঁর কর্মসূচি থেকেই প্রায় ৩০% অংশগ্রহণকারী কানাডার স্বাস্থ্যখাতে নিজেদের পেশায় স্থিত হতে পেরেছেন।

শুরুতে শুধু চিকিৎসকদের জন্য হলেও পরবর্তীতে এই ব্রিজিং মডেলটি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত যেকোনো আন্তর্জাতিক পেশাজীবীর জন্য উন্মুক্ত করা হয় – যেমন বিদেশি নার্স, ফার্মাসিস্ট, প্রযুক্তিবিদ, এমনকি জীববিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি পটভূমির প্রার্থীরাও এতে অংশ নিতে পারেন। প্রতি সেমিস্টারে সীমিত সংখ্যক (প্রায় ২৫ জন) শিক্ষার্থী নিয়ে ড. ভূঁইয়া এই বহুবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে “ডিস্টিংগুইশড ভিজিটিং প্রফেসর” উপাধি দিয়ে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হয়, যাতে তিনি স্বাধীনভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেন। এক দশক ধরে একক প্রচেষ্টায় কর্মসূচিটি সফলভাবে পরিচালনার পর প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে তিনি ২০২২ সালে প্রোগ্রামটিকে ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর কন্টিনিউয়িং এডুকেশন বিভাগের অধীনে স্থানান্তরিত করেন, যাতে এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ীভাবে চালু থাকে।

ড. শাফী ভূঁইয়ার আইটিএমডি প্রোগ্রাম অভিবাসী স্বাস্থ্যপেশাদারদের মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়েছে। তিনি মনে করেন, কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে যে কাঠামোতে চলেছে তাতে জনবলগত পরিবর্তন আনা জরুরি, কারণ বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যার ৫০% এরও বেশি মানুষ অভিবাসী পটভূমি থেকে এসেছে। স্বাস্থ্যখাতে বৈচিত্র্য ও নতুন দক্ষতা যুক্ত করতে হলে উচ্চশিক্ষিত অভিবাসী চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। তাঁর কৌশল ছিল “Education is the Solution” – অর্থাৎ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাধান বের করতে হবে। আগে থেকেই যত বেশি দক্ষ পেশাজীবী প্রস্তুত থাকবেন, পরিবর্তনের সময় এলে তত দ্রুত তারা দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন। শুধুই পরিবর্তনের কথা বলে গেলে আরেক ৫০ বছরেও কিছু হবে না, তাই তিনি শিক্ষার মাধ্যমে পরিবর্তনের বীজ বপন করেছেন। সম্প্রতি (২০২২ সালে) মেডিকেল কাউন্সিল অব কানাডার বার্ষিক সম্মেলনে ড. ভূঁইয়া একাধিক কর্মশালা পরিচালনা করেন, যেখানে আগামী তিন বছরের জন্য স্বাস্থ্যখাতে এই ধরনের পরিবর্তনের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে এখন তিনি সুফলের আভাস দেখতে পাচ্ছেন – অভিবাসী স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকের জন্য ক্যারিয়ারের বন্ধ দরজা খুলতে শুরু করেছে এবং কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ধীরে ধীরে বহুসাংস্কৃতিক মেধার অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ও টরন্টো মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ

কানাডায় নতুন ভূমিকা পাওয়ার পর ড. ভূঁইয়া শীঘ্রই নিজেকে পুনরায় একাডেমিয়ায় জড়িত করেন। তত্ত্বাবধায়কের পরামর্শ অনুসারে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর গ্লোবাল হেলথ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০১২ সালের মধ্যেই তিনি সেখানে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) এবং পিএইচডি পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন কয়েকটি কোর্স চালু করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি সেমিনার (বহুশাখা-ভিত্তিক আলোচনা শ্রেণি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (আন্তর্জাতিক উন্নয়ন) বিষয়ক কোর্স। এসব কোর্সের পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ড. ভূঁইয়া নিজেই নকশা করেন এবং ক্লাসে পড়ানো শুরু করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ কোর্সগুলোর খবর পৌঁছে দেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এতে নাম লেখায়। শিক্ষার্থীদের বিপুল সাড়া পেয়ে ২০১২ সালে চালু এসব কোর্সকে তিনি নিজের এক বড় অর্জন হিসেবে স্মরণ করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি ড. ভূঁইয়া টরন্টো মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক রাইয়ারসন) একজন বিশিষ্ট অতিথি অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ভূমিকায় তিনি অভিবাসী চিকিৎসকদের জন্য আইটিএমডি ব্রিজিং প্রোগ্রামটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন, যা ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমান্তরালে কাজ করে তিনি একদিকে একাডেমিয়া ও অন্যদিকে বাস্তব জগৎ (শিল্প ও চাকরিক্ষেত্র) – এই দুইয়ের মধ্যে একটি সেতু গড়ে তুলতে পেরেছেন। ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর অধ্যাপক হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রোগ্রাম কমিটি, ভর্তি কমিটি এবং কারিকুলাম উন্নয়ন কমিটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, একইসাথে নানাবিধ গবেষণা প্রকল্পেও সক্রিয় থেকেছেন। এই বহুমুখী ভূমিকা তাঁকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে – তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে একাডেমিক জ্ঞান ও বাস্তব দক্ষতার সংযোগ ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করা যায়।

বহুবিষয়ক ও সমাধানমুখী কারিকুলাম উন্নয়ন

ড. ভূঁইয়ার শিক্ষাদানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর বহুবিষয়ক এবং সমাধানমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিচালনায় এক ধরনের পেশার লোক যথেষ্ট নয়; বরং বিভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় দরকার। তাই তাঁর গ্লোবাল হেলথ ক্লাসগুলোতে মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ছাড়াও নার্স, ফার্মাসিস্ট, প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্যবিদ, নৃতত্ত্ববিদসহ নানা পটভূমির ছাত্রছাত্রী অংশ নিতে পারত। এই বৈচিত্র্যময় শ্রেণীকক্ষে উন্নত দেশের (জি৭ দেশগুলোর) স্বাস্থ্যব্যবস্থা, তেল-সমৃদ্ধ মধ্যমআয়ের দেশ ও স্বল্পোন্নত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উদাহরণ তুলনা করে বিশ্লেষণ করা হতো। উন্নত দেশ থেকেই কেবল শিখতে হবে তা নয় – উন্নয়নশীল দেশের উদ্ভাবনী পদ্ধতি থেকেও অনেক কিছু জানা যেতে পারে। এমন আন্তর্দেশীয় ও আন্তর্বিষয়ক শিক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীরা উদ্দীপনার সাথে গ্রহণ করেছে।

প্রথাগত মুখস্থবিদ্যার বদলে ড. শাফী ভূঁইয়া বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শিখনকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর ক্লাসে কোনো একক পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ না করে বিভিন্ন গবেষণা, প্রকল্প ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উদাহরণ নিয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষার্থীদের তিনি চ্যালেঞ্জ দেন আসল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তার সমাধান খুঁজতে। তারা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের সমস্যা নিয়ে নিজ নিজ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে, সহপাঠী ও শিক্ষকের মতামত আলোচনা করে এবং সমাধানমুখী উপায় উদ্ভাবন করে। এই “সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান” পদ্ধতির ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্য মুখস্থ না করে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করে। ক্লাসরুমে কোনো কাল্পনিক সিলেবাস নয়, বরং বাইরের জগতের চ্যালেঞ্জ কেমন তা তুলে ধরে সমাধানের কৌশল অনুশীলন করানো হয়। ফলে ড. ভূঁইয়ার কোর্সগুলো অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং শিক্ষার্থীরা সেগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদে বাস্তব জীবনেও উপকৃত হয়।

ড. শাফী ভূঁইয়া লক্ষ্য করেন যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সিলেবাস এখনও অনেকাংশে সেকেলে ধাঁচের; ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা মুখস্থনির্ভর শিক্ষা আজকের কর্মক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি নিজে কর্পোরেট ও শিল্পখাতে কাজ করে প্রত্যক্ষ করেছেন কী ধরনের দক্ষতা বাস্তবে দরকার হয়। সেই অভিজ্ঞতা তিনি পাঠ্যক্রম উন্নয়নে কাজে লাগিয়েছেন, যাতে তাঁর শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি শেষ করে বাস্তব জগতে দ্রুত নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এই প্রয়োজনমাফিক কারিকুলাম উন্নয়নের মাধ্যমে ড. ভূঁইয়া মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করে তোলার চেষ্টা করছেন।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির প্রয়োগ ও নবতর উদ্যোগ

বর্তমান যুগে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও ব্যাপক করা যায় – এই ধারণাটি ড. ভূঁইয়া আন্তরিকভাবে প্রচার করেন। তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের বোঝান যে শুধুমাত্র চিকিৎসক, নার্স বা টেকনোলজিস্ট হয়ে হাসপাতালে কাজ করার প্রচলিত ধারা বদলে যাচ্ছে; এখন “হেলথ ইনফরমেটিক্স” (স্বাস্থ্য তথ্যবিদ্যা) এবং ই-হেলথের মতো নতুন ক্ষেত্র দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। হেলথ ইনফরমেটিক্স হল তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (Artificial Intelligence – AI) কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যসেবার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনা করার বিজ্ঞান। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক এবং কম্পিউটার প্রকৌশলীদের যৌথ প্রচেষ্টায় চমৎকার নতুন সমাধান বেরিয়ে আসছে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও সর্বসুলভ করে তুলতে পারে।

ড. ভূঁইয়া বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে এআই ও তথ্যপ্রযুক্তি স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন, বাংলাদেশের মতো দেশে ডায়াবেটিসের রোগীরা সাধারণত ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে তাতেই বিষয়টি শেষ করেন; তাদের জীবনধারা কীভাবে উন্নত করা যায় বা অন্যান্য রোগীর অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা যায়, তা জানার সুযোগ নেই। ড. শাফীর মতে, যদি একটি এআই-চালিত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় যেখানে ডায়াবেটিক রোগীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ বিনিময় করতে পারবেন, তবে একে অন্যের থেকে শিখে তারা জীবনযাপনের গুণগত মান উন্নত করতে পারবেন।

আবার, দেশের হাসপাতালগুলোর উদাহরণ ধরা যাক। কোথায় কতটি শয্যা খালি আছে, কতজন রোগী ভর্তি হয়েছেন বা ছাড়বেন – এসব তথ্য বর্তমানে হাতে লিখে রাখা হয়, যা প্রায়ই অস্বচ্ছ ও ত্রুটিপূর্ণ হয়। ড. ভূঁইয়া মনে করেন, একটি আধুনিক ডেটাবেস ও এআই-সিস্টেম চালু করলে হাসপাতালের পরিচালক প্রতিদিন সকালে কম্পিউটারে দেখে নিতে পারবেন গত এক মাসে কী পরিমাণ রোগী ভর্তি হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনে কতজন রোগী হাসপাতাল ছাড়বে ও কোন কোন বেড খালি হবে। এর মাধ্যমে শয্যা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসবে, অবৈধ তদবির ও অনিয়ম কমবে এবং সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের আরেকটি দৃষ্টান্ত হল মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থায় অভিনব উদ্যোগ। ড. ভূঁইয়ার তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিকভাবে একটি “মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য হ্যান্ডবুক” সফটওয়্যারে রূপান্তরের কাজ চলছে। বর্তমানে অনেক দেশে মাতৃসেবা ও শিশুপালনের তথ্য হাতে লেখা বুকলেটে রাখা হয়; তিনি সেটিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এনে এমনভাবে গড়ে তুলছেন যাতে একজন মা তাঁর গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সকল তথ্য অনলাইনে একটি ফর্মের মাধ্যমে পূরণ করতে পারেন এবং সেই ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ডেটাবেসে জমা হয়। এতে একই তথ্য বারবার হাতে লিখতে হবে না, ভুলের সম্ভাবনা কমবে এবং নীতিনির্ধারকরা বৃহত্তর তথ্যসমৃদ্ধ ডেটাবেস থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ড. ভূঁইয়া তরুণ প্রজন্মকে এই বার্তাও দেন যে স্বাস্থ্যখাতে অবদান রাখতে হলে সরাসরি চিকিৎসক হওয়ার দরকার নেই। একজন ইঞ্জিনিয়ার বা আইটি বিশেষজ্ঞও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সমানভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন – প্রয়োজন কেবল মানবকল্যাণে তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে কাজে লাগানোর মানসিকতা। তিনি উদীয়মান প্রযুক্তিবিদদের আহ্বান জানান স্বাস্থ্য তথ্যবিশ্লেষণ, বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশল, ডেটা বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য, যাতে তাঁরা তাদের প্রযুক্তিগত মেধাকে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু স্বাস্থ্য ইনফরমেটিক্সের স্নাতকোত্তর কোর্সগুলোর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ভর্তির জন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান যেমন দরকার, তেমনি মানুষের সেবা করার স্পৃহাও দেখাতে হয়। ড. ভূঁইয়ার পরামর্শ মতে, যারা এই ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের উচিত পড়াশোনার আবেদনপত্র ও সাক্ষাৎকারে নিজেদের নেতৃত্বগুণ, যোগাযোগদক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা তুলে ধরা। ইতোমধ্যে তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষিত অনেকেই এই নতুন শাখায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে কমিউনিটিতে অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশে তথ্য-উপাত্তের অবকাঠামো ও গবেষণার সীমাবদ্ধতা

নিজ দেশ বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ড. শাফী ভূঁইয়া উল্লেখ করেন যে স্বাস্থ্য-সেবায় সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের অভাব একটি বড় সমস্যা। নব্বইয়ের দশকের শেষে তিনি যখন স্বল্প ওজনের নবজাতক (লো বার্থ ওয়েট বেবি) নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছিলেন, তখন দেখেন একই বিষয়ে তিন রকম পরিসংখ্যান প্রচলিত – সরকারের এক হিসাব, এনজিওগুলোর আরেক হিসাব, এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছে উপস্থাপিত আরও এক ভিন্ন হিসাব। অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য একক ডেটাবেস নেই; প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী আলাদা আলাদা সংখ্যা তুলে ধরা হয়। সরকার যখন দাতাদের কাছ থেকে অনুদান চাইছে, এক ধরনের তথ্য দিচ্ছে; এনজিওরা অর্থ পেতে অন্য তথ্য দিচ্ছে, আর প্রকল্প শেষ হলে “সাফল্য” দেখাতে আরও বাড়িয়ে আলাদা চিত্র দিচ্ছে। তথ্যের এই জগাখিচুড়ি যাচাই করার বা একত্র করার জন্য কার্যকর কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা নেই। ড. ভূঁইয়া এ পরিস্থিতিকে খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেন। এর জন্য তিনি কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ না করে সামগ্রিক শিক্ষা ও প্রশাসনব্যবস্থার ত্রুটিকে চিহ্নিত করেন।

বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোতে গবেষণার উপর পর্যাপ্ত জোর দেওয়া হয় না বলে ড. শাফীর পর্যবেক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী পাঠ্যবই মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করে ডিগ্রি নেয়; গবেষণা-মনোভাব বা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা তাদের গড়ে ওঠে না। ফলে কর্মক্ষেত্রে – সরকারি হোক বা বেসরকারি – দীর্ঘমেয়াদে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। উদাহরণস্বরূপ, উন্নত দেশে একটি বিষয় নিয়ে দশ-বিশ বছর ধরে কোহোর্ট স্টাডি (একই ধরনের জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করে পরিচালিত গবেষণা) চলতে থাকে, যার ফলে শক্তিশালী ডেটাবেস গড়ে ওঠে এবং নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ ধরনের ধারাবাহিক গবেষণা খুবই বিরল। ফলে “ডেটা ব্যাংক” বলতে তেমন কিছু নেই – আমরা স্থানীয় নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রেও পাশ্চাত্যের তথ্যের উপর নির্ভর করি এবং সেটাকে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। বিদেশের প্রেক্ষাপটের তথ্য আমাদের অবস্থায় পুরোপুরি খাটে না, তাই তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে কার্যকর ফল নাও আসতে পারে।

গবেষণা অবকাঠামো দুর্বল থাকার আরেকটি কারণ হচ্ছে এই খাতে বিনিয়োগের অভাব। ড. ভূঁইয়া তুলনা করে বলেন, তিনি যে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ পাবলিক হেলথে কর্মরত, সেখানে একবছরে একটি ছোট বিভাগের গবেষণা বাজেটই ২৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট গবেষণা বাজেটই ওই এক বিভাগের সমতুল্য নয়। জাপান ও পশ্চিমা দেশগুলো অবকাঠামো তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নতুন ল্যাব ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলছে, আর আমাদের দেশে প্রায়ই গবেষণা একটি প্রকল্পনির্ভর কর্মকাণ্ড হিসেবেই থাকে। কোনও বিদেশি বা দাতা-প্রদত্ত প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে গবেষণা ও তথ্য-সংগ্রহও শেষ – প্রাপ্ত ফলাফল থেকে কী লেসন লার্নড (শিক্ষা) হলো, সেটি নিয়ে পরবর্তীতে আর এগোনো হয় না। ড. ভূঁইয়ার মতে, এই ধরণের “প্রমাণ থেকে প্রসার” – অর্থাৎ ছোট পর্যায়ে প্রমাণিত সমাধানকে বড় স্কেলে বিস্তৃত করার মনোভাব দেশে অনুপস্থিত। ছোট ছোট গবেষণার ফলাফল থেকে শেখা জ্ঞানকে ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত করলে তবেই জাতীয় পর্যায়ে টেকসই পরিবর্তন আসতে পারে।

তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণা অবকাঠামোর এই দুর্বলতার প্রভাব সরাসরি স্বাস্থ্যনীতিতে পড়ছে। ড. ভূঁইয়া উদাহরণ দেন, বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যে আমরা এখনও প্রসবকালীন মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিহীনতা দূর করা নিয়েই মূলত কাজ করছি। এই মৌলিক সমস্যা মোকাবিলায়ই আমাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় হয়ে যায়। আমরা খুব কম ভাবি কেন একজন মা প্রসবের পর মারাত্মক বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন, অথবা সন্তান জন্মের পর তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য কীভাবে উন্নত করা যায় – উন্নত বিশ্বে যেখানে এই বিষয়ে গবেষণা চলছে, আমাদের এখানে তা উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এখনো সকল প্রসূতি মা প্রসব-পূর্বকালীন নির্ধারিত তিনটি চেকআপের আওতায় আসেন না, নবজাতক জন্মানোর পরও নিয়মিত চেকআপে ফেরেন না; শত চেষ্টাতেও এই কভারেজ ৬০%-৭০% এর বেশি হচ্ছে না। কিন্তু কেন আসতে পারছেন না – সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের কোনও শক্তিশালী ডেটাবেস নেই। আবার হাসপাতালে রেজিস্টারে দেখা যায় ৫০ জন প্রসূতির একই রকম রোগলক্ষণ বা একই ধরনের কারণ লিখে দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। মৃত্যুর কারণ নিবন্ধনে অনেক সময় আসল কারণ না লিখে “কার্ডিওরেসপিরেটরি ফেলিউর” (হৃদপিণ্ড ও শ্বাসতন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ) লিখে দায় সারছেন অনেকে – যা আসলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নয়, বরং একটি পরিণতির বর্ণনা মাত্র। এভাবে ভুল তথ্যে ভরা ডেটা নিয়ে কাজ করলে নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ড. শাফী ভূঁইয়া জোর দিয়ে বলেন, যখন শিক্ষা-ব্যবস্থা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য-প্রশাসন পর্যন্ত সবাই গবেষণার মূল্য বুঝবে এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেবে, তবেই স্বাস্থ্যখাতে সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব হবে।

ইনোভেশন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সহযোগিতার স্বপ্ন

ড. শাফী ভূঁইয়ার পেশাগত জীবনের মিশন তিনটি মূল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে: তরুণ পেশাজীবীদের ক্ষমতায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য তিনি যেকোনো নতুন ধারণা বা উদ্ভাবন গ্রহণ করতে এবং বহুখাতের সাথে সহযোগিতা করতে সদা প্রস্তুত। তিনি নিজেকে কেবল একজন অধ্যাপক নন, বরং একজন কারিকুলাম উদ্ভাবক, একজন স্বাস্থ্যব্যবস্থা-সংস্কারক এবং একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্র, সরকার, এনজিও ও আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধনকারী হিসেবেও গড়ে তুলেছেন। তাঁর বিশ্বাস, একটি বৃহৎ লক্ষ্য পূরণে বিভিন্ন পথ ও পন্থা একযোগে চেষ্টা করতে হয় – একদিকের প্রচেষ্টা ফল না দিলে অন্যদিক দিয়ে সমাধান আসতে পারে। একই কারণে তিনি কখনও নিজেকে একটি মাত্র ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখেননি।

দূরদর্শী নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে ড. ভূঁইয়ার কর্মপদ্ধতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য সবসময় স্থির থাকে, তবে তা অর্জনের পথপ্রকরণ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তিনি নিজেই বলেন, “আমি যা আজ করছি, কালকেও যদি তাই করি, পরের দিনও যদি তাই করি, আমি ভিন্ন ফল পাব না।” অর্থাৎ একই পদ্ধতি পুনরাবৃত্তি করে ভিন্ন সফলতা আশা করা যায় না – তাই ক্রমাগত নতুন কৌশল অবলম্বন জরুরি। ড. শাফী ভূঁইয়া এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রায় ২০ বছর মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার পর উত্তর আমেরিকায় এসে ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন; প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে নতুন কিছু শিখে তিনি নিজের কর্মপন্থায় পরিবর্তন এনেছেন। কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি – সেই মৌলিক লক্ষ্য: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা এবং নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সুস্থ সমাজ গঠন। এই স্থির লক্ষ্যের দিকে এগোতে গিয়ে পথ পরিবর্তন করতে তাঁকে কখনও দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়নি।

ড. ভূঁইয়ার দৃঢ় বিশ্বাস হল অধ্যবসায় বা লাগাতার চেষ্টা। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বারবার বলেন, কখনও হাল ছেড়ো না। সাফল্য কোনো গন্তব্য নয়, এটা এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া – ছোট ছোট অর্জনগুলো সাফল্যের ধাপ মাত্র, কিন্তু শেখার ও কাজের চক্র থেমে থাকে না। তাই একটা কাজে সাময়িক ব্যর্থতা এলে থেমে না গিয়ে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি মনে করেন, একা চলার চেয়ে দল গঠন করে চলা ভালো; একা এগোলে হয়তো দ্রুত চলা যায়, কিন্তু দল নিয়ে এগোলে নিশ্চিতভাবেই বহুদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। এজন্য একটু ধৈর্য ধরে একসাথে পথ চলতে পারার মানসিকতা রাখতে হবে। ড. শাফী ভূঁইয়ার নিজের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় – যুদ্ধকালীন শৈশব থেকে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ, বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন, নতুন দেশে সংগ্রাম এবং বৈশ্বিক পরিসরে নেতৃত্ব প্রদান – সবই প্রমাণ করে যে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অধ্যবসায় থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

উপসংহার: দূরদৃষ্টি, শিক্ষা, সহযোগিতা ও অধ্যবসায়ের পাঠ

ড. শাফী ভূঁইয়ার জীবনকাহিনী থেকে আমরা কয়েকটি মূল্যবান শিক্ষা পাই। প্রথমত, দৃঢ় দূরদৃষ্টি ও বড় স্বপ্ন দেখতে জানতে হবে – শৈশবের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তিনি মানবসেবার স্বপ্ন দেখা থামাননি, বরং সেই স্বপ্ন পূরণে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। দ্বিতীয়ত, জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা মানুষের সম্ভাবনাকে অসীম মাত্রা দিতে পারে – উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে ড. শাফী ভূঁইয়া নিজেকে বিশ্বমানে গড়ে তুলে তারপর সেই জ্ঞান সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত নিয়েছেন। তৃতীয়ত, সহযোগিতার মানসিকতা ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম – তিনি বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে মেলবন্ধন তৈরি করে দেখিয়েছেন যে যৌথ প্রচেষ্টায় বড় পরিবর্তন আনা সহজ হয়। বন্ধু ও সহকর্মীদের সহযোগিতা জীবনে সাফল্যের দুয়ার খুলে দিতে পারে, তাঁর কানাডায় দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাই এর উদাহরণ।

সবশেষে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো অধ্যবসায় এবং হার না মানার মানসিকতা যে কোনো অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে। ড. ভূঁইয়ার জীবন যুদ্ধাহত শিশুর বেঁচে ওঠা থেকে শুরু করে একাধিক মহাদেশে নেতৃত্বদান পর্যন্ত প্রতিটি পরতে এই অধ্যবসায়ের ছাপ স্পষ্ট। বাধা এসেছে বারবার – ব্যক্তিগত, পেশাগত, সামাজিক – কিন্তু তিনি কখনও হাল ছাড়েননি। বরং প্রতিটি বাঁক থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে গেছেন। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তাঁর মূল বার্তাও সেটাই: “কখনও হাল ছেড়ো না।” হয়তো পথ পরিবর্তন করতে হতে পারে, নতুন কৌশল নিতে হবে, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

ড. শাফী ভূঁইয়ার গল্প আমাদের দেখিয়েছে, একটি মানুষ প্রত্যন্ত গ্রামের যুদ্ধাহত শৈশব থেকেও বৈশ্বিক অঙ্গনে পরিবর্তনের নেতা হয়ে উঠতে পারেন যদি তিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, শিক্ষানুরাগী, মিলনসাধক এবং অধ্যবসায়ী হন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর উদাহরণ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজেদের মেধা ও মনন একইভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের সমাজে এবং বিশ্বমঞ্চে আরও বহু ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হবে – এটাই এই জীবনগাথার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি ইউটিউবে দেখুন:

সাক্ষাৎকারের তারিখ:
২৫ অক্টোবর ২০২৪ (অনলাইন)

উপস্থাপক:

ড. মশিউর রহমান
(সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করেছেন)

সাক্ষাৎকার কো-অর্ডিনেশন:

Zaineb Bintay Ali (জয়নাব বিনতে আলী)
Gujarat Technological University, Gujarat, India
(সাক্ষাৎকারটি কো-অর্ডিনেট করেছেন)

প্রশ্নমালা প্রণয়নে সহায়তা:

Md. Jamil Khan (মোঃ জামিল খান)
Metropolitan University
(সাক্ষাৎকারের প্রশ্নমালা প্রস্তুত করেছেন)

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org