রাত দুইটা। ল্যাবের কাঁচের জানালায় বৃষ্টি ঠুকঠুক করে পড়ছে। এক তরুণ গবেষক চুপচাপ বসে আছে মনিটরের সামনে। তার সামনে আবারও সেই লাল লেখা, “Error”. তিন মাসের কাজ, কোনো ফল নেই। সে মনে মনে ভাবে, হয়তো আমি ভুল জায়গায় এসেছি। হয়তো আমি বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য বানানোই নই। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো কোণে আলোর মতো জ্বলে ওঠা কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা তার মাথায় আসে না। তার মনে আসে শুধু একটি শব্দ, ‘ব্যর্থতা’। আর এই শব্দটাই আজ তাকে ঘিরে ধরেছে নিঃশ্বাসের মতো।
কিন্তু বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য সত্য হলো, ব্যর্থতা এখানে কোনো অচেনা অতিথি নয়, ব্যর্থতাই বরং নিয়মিত সঙ্গী। বড় বড় আবিষ্কারের ইতিহাসে “ভুল” শব্দটাই সবচেয়ে ঘন ঘন লেখা থাকে। টমাস এডিসন বলেছেন, তিনি বাল্ব আবিষ্কারে হাজারবার ব্যর্থ হননি, বরং হাজারটি কাজের পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছিলেন, যেগুলো কাজ করে না। এই না-করা কাজগুলোই শেষ পর্যন্ত তাকে সঠিক পথে নিয়ে গেছে। মেরি কুরি বছরের পর বছর ব্যর্থ পরীক্ষার ধূসর ছাই ঘেঁটে খুঁজে পেয়েছিলেন একফোঁটা আলো। নিউটনের গাণিতিক সমীকরণও একদিনে জন্ম নেয়নি, সেগুলো বহু ভুলের খাতায় বড় হয়েছে।
বাংলাদেশের গবেষকরা এই ব্যর্থতার ভার আরও একটু বেশি বহন করেন। আজও অনেক গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, অনেক লাইব্রেরিতে জার্নালের সাবস্ক্রিপশন নেই, অনেক সময় একটুখানি তহবিলের অভাবে গোটা গবেষণা থেমে যায়। UNESCO বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গবেষণার ব্যর্থতার বড় কারণ শুধুই মেধার ঘাটতি নয়, বরং অবকাঠামো ও সহায়তার অভাব। OECD-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, যেসব দেশে গবেষণায় বিনিয়োগ বেশি, সেখানে ‘ফেইলিউর লার্নিং সিস্টেম’ মানে ব্যর্থতা থেকে শেখার কাঠামো গড়ে উঠেছে শক্তভাবে। আমাদের এখানে সেই কাঠামো দুর্বল, ফলে ব্যর্থতা শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, মানসিক যুদ্ধেও রূপ নেয়।
এই যুদ্ধটা শুরু হয় নিজের সঙ্গে। “আমি পারছি না” এই বাক্যটা গবেষণার সবচেয়ে বিপজ্জনক ভাইরাস। এটি ধীরে ধীরে তোমার কৌতূহল খেয়ে ফেলে। অথচ বিজ্ঞান আসলে আত্মবিশ্বাসের প্রদর্শনী নয়, বিজ্ঞান হলো প্রশ্নের প্রতি ভালোবাসা। তুমি যত বেশি প্রশ্নকে ভালোবাসবে, তত কম ভয় পাবে ভুলকে। কারণ ভুলই বলে দেবে তোমার চিন্তায় কোথায় ফাঁক, তোমার পদ্ধতিতে কোথায় দুর্বলতা।
ব্যর্থতাকে কাজে লাগানোর প্রথম শর্ত হলো তাকে লুকানো নয়, বরং তার মুখোমুখি হওয়া। যারা ব্যর্থতাকে ডায়েরিতে লিখে রাখে, তারাই একদিন সাফল্যের স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে পারে। আজকের বড় ল্যাবগুলোতে “নেগেটিভ রেজাল্ট” নিয়েও আলোচনা হয়। কারণ কোনো ফল না পাওয়াও মূল্যবান তথ্য। এটি তোমাকে বলে দেয়, কোন পথে আর না হাঁটলেও চলে। এই উপলব্ধি যদি আমাদের দেশে পাত্তা পেত, তবে অনেক গবেষণাই নতুনভাবে শুরু হওয়ার সুযোগ পেত।
ব্যর্থতার আরেকটি রূপ হলো সময় নষ্ট হওয়া বলে মনে হওয়া। তুমি মনে করতে পারো, তিন মাসের কাজ বৃথা গেল। কিন্তু সত্যি বলতে, এই তিন মাস তোমাকে দিয়েছে অভিজ্ঞতা, যা আর কোনো বই দিতে পারবে না। এই অভিজ্ঞতাই তোমার পরবর্তী গবেষণাকে ত্বরান্বিত করবে। বিশ্বখ্যাত গবেষক রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন, প্রকৃত আবিষ্কার ঘটে তখনই যখন তুমি বুঝতে পারো, তুমি আদতে কতটা জান না। এই না-জানাটাই তোমাকে সামনে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা ভুলকে শাস্তি হিসেবে দেখতে শিখি। প্রশ্ন করলে নম্বর কাটে, ভুল করলে লজ্জা দেওয়া হয়। এই সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণাগারে ঢুকলে গবেষণা শ্বাস নিতে পারে না। অথচ বিজ্ঞান এমন এক জায়গা যেখানে ভুলটাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যদি তুমি ভুলকে রঙিন করে তুলতে পারো, তবে বিজ্ঞান তোমাকে আশ্চর্য উপহার দেবে। কারণ ভুলখানি যদি না হত, তবে সঠিক উত্তরটি কখনো জন্মাত না।
আরো একটি ভয় কাজ করে—অন্যরা কী বলবে? সহকর্মী, সুপারভাইজার, বন্ধু, পরিবার। কিন্তু মনে রেখো, ইতিহাসে কোনো গবেষকের নাম লেখা নেই যিনি প্রথম চেষ্টায় সব ঠিক করে ফেলেছেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রথমে খারিজ হয়েছিল, ডারউইনের বিবর্তন নিয়ে হয়েছিল উপহাস। আজ আমরা তাদের নাম বইয়ের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখি। সময়ই আমাদের বিচারক, মানুষের মুখ নয়।
তোমার ব্যর্থতা এই অর্থে সবচেয়ে ব্যক্তিগত শিক্ষক। সে তোমাকে শিখাবে কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন আরও ধারালো করতে হয়, কীভাবে ছোট সাফল্য গুনতে হয়। তুমি যদি প্রতিটি ব্যর্থতার পর নিজেকে নতুন করে সাজাতে পারো, তবে তুমি কেবল গবেষণা নও, তুমি নিজেকেই গবেষণা করতে শিখছো।
একসময় তুমি লক্ষ্য করবে, তুমি আর ভয় পাও না ব্যর্থতাকে। বরং তুমি তার কাছ থেকে শিখতে শুরু করেছো। তখনই পরিবর্তন ঘটে। তুমি তখন ব্যর্থতাকে শত্রু নয়, সহযাত্রী মনে করো। যে সহযাত্রী তোমাকে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে সাহায্য করে, যদিও হাত কেটে যায়, হাঁটু রক্তাক্ত হয়।
এই লেখাটা হয়তো তুমি পড়ছো কোনো ক্লান্ত দিনে, যখন মনে হচ্ছে কিছুই ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু মনে রেখো, আজকের এই অস্থিরতাই একদিন তোমার শক্তি হবে। আজকের এই “Error”-ই একদিন হয়ে উঠবে আবিষ্কারের প্রথম লাইন। যদি তুমি আজ হাল না ছাড়ো, তবে আগামীকাল ইতিহাস তোমার নাম লিখবে না হয়তো বড় অক্ষরে, কিন্তু গভীরতায়।
গবেষণায় সফলতা মানে শিরোনাম নয়, সফলতা মানে টিকে থাকা। টিকে থাকা মানে প্রতিদিন নিজের সন্দেহকে অতিক্রম করা। আর ব্যর্থতা, সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার। সেখানে তুমি বারবার পড়ে যাও, আর প্রতিবার উঠে দাঁড়াও নতুন করে।
রাতের বৃষ্টি একসময় থামে। জানালার কাঁচে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে নিচে নেমে যায়। মনিটরের লাল লেখা তখন আর শুধু ‘Error’ নয়, সেটি হয়ে ওঠে এক নতুন দরজা। আর সেই দরজার ওপারেই অপেক্ষা করে তোমার পরবর্তী সফলতা।

Leave a comment