রাত গভীর। ঢাকার কোনো এক ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে তুমি শহরের আলো দেখছ। হাজার হাজার জানালা জ্বলছে, প্রতিটা জানালার ভেতর আলাদা গল্প, আলাদা স্বপ্ন। তোমার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন—“আমি ভবিষ্যতে কী হতে চাই?” এই প্রশ্নটা ছোট মনে হয়, কিন্তু এর ওজন পাহাড়ের মতো। কারণ এই প্রশ্নে লুকিয়ে আছে তোমার পরের দশ বছরের দিশা, তোমার জীবনের মানে।
তুমি হয়তো অনেক দিন ধরেই বলছ, “আমি বিজ্ঞানী হতে চাই।” কথাটা শোনায় গর্বের, রোমান্টিকের মতো। কিন্তু থেমে একবার ভাব, এই বাক্যটা তুমি কোথা থেকে শিখেছ? পরিবারের প্রেসার থেকে? কলেজের পোস্টার থেকে? নাকি কারও সাফল্যের গল্প দেখে? বিজ্ঞানী হওয়া কি তোমার নিজের স্বপ্ন, নাকি ধার করা স্বপ্ন, সেটা বোঝাই আসল বিজ্ঞান শুরু করার প্রথম ধাপ।
বাংলাদেশে বিজ্ঞানী হওয়া মানে অনেক সময় অদৃশ্য যুদ্ধ করা। সীট কম, ল্যাব কম, গাইড কম, ফান্ড কম। চাকরি অনিশ্চিত। পরিবার ভাবে, “বিজ্ঞানে ভবিষ্যৎ আছে তো?” এই প্রশ্ন তোমার কানে প্রতিদিন বাজে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি দশজন বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয়জন মাঝপথে পথ বদলায়, আর কারণটা আগ্রহের অভাব নয়, নিরাপত্তাহীনতা। টাকা নেই, গাইড নেই, সুযোগ নেই—এই অভিযোগে আমরা বড় হই। অথচ আশ্চর্যজনক হলো, বিজ্ঞানের পথই সবচেয়ে বেশি দরজা খুলে দেয়, যদি তুমি ধৈর্য ধরতে পারো।
নিজেকে জিজ্ঞেস করো, তুমি কি সত্যিই সমস্যার ভিতরে ঢুকতে ভালোবাসো, না শুধু সাফল্যের গল্প শুনতে ভালোবাসো? বিজ্ঞানীর জীবন মানে কেবল আবিষ্কারের আলো না, মানে অন্ধকারেও পথ খোঁজা। তুমি যদি জিজ্ঞেস করো, “আমি কি সহজ জীবন চাই, না অর্থবহ জীবন?”—তাহলে হয়তো উত্তর পেতে শুরু করবে।
ভূমিকম্প কেন হয়, ভাইরাস কিভাবে বদলায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের কাজ কেড়ে নেবে কিনা, নদী কেন শুকায়—এই প্রশ্নগুলো তোমার ঘুম কেড়ে নেয়, নাকি তুমি এসবকে পাশ কাটিয়ে চলে যাও? বিজ্ঞানী হওয়া মানে কৌতূহলের ঘুম হারানো। বিজ্ঞানী হওয়া মানে আরাম পছন্দ না করা।
বিশ্বের বড় বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছিলেন কষ্টের পথ। নিউটন যুদ্ধের সময় গ্রামে ফিরে প্লেগের ভয়ে লুকিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেই তৈরি হয়েছিল তার মহান তত্ত্ব। মেরি কুরি অন্ধকার ঘরে বসে বিষাক্ত ধাতু নিয়ে খেলেছেন, শরীর নষ্ট করেছেন, কিন্তু বিজ্ঞানকে বাঁচিয়েছেন। আইনস্টাইন চাকরি না পেয়ে অফিসে বসে ফর্ম সাইন করেছেন, আর রাতে লিখেছেন সমীকরণ। তারা কেউ নিরাপদ জীবন বেছে নেননি, তারা বেছে নিয়েছিলেন অর্থপূর্ণ যন্ত্রণা।
তুমি যদি বিজ্ঞানী হতে চাও, নিজেকে জিজ্ঞেস করো, তুমি কি স্বীকৃতি চাও, না সত্য? খ্যাতি চাও, না কৌতূহল? বিদেশ চাও, না কাজ? ল্যাবের কোট চাও, না প্রশ্নের জ্বালা? ভুল উত্তর নেই, ভুলটা তখনই হয়, যখন তুমি নিজের সঙ্গে মিথ্যে বলো।
বাংলাদেশে গবেষণার জন্য বরাদ্দ জিডিপির এক শতাংশেরও কম। OECD দেশগুলো সেখানে তিন শতাংশ ছাড়ায়। ফারাকটা শুধু টাকার না, ফারাকটা স্বপ্নের। এখানে বিজ্ঞানী হওয়া মানে বেতনের চেয়ে বিশ্বাসে চলা। তোমার পরিবার যখন বলে, “ব্যবসা করো, ব্যাংকে ঢুকো,” তখন তোমার ভেতরের কণ্ঠ কী বলে?
বিজ্ঞানী মানে চাকরি না, বিজ্ঞানী মানে দায়িত্ব। তোমার হাতের জ্ঞান একদিন রোগ সারাবে, ফসল বাঁচাবে, সেতু দাঁড় করাবে, প্লাবন রুখবে। তুমি যদি এই দায়িত্ব নিতে চাও, তাহলেই তুমি বিজ্ঞানী হওয়ার যোগ্যতা রাখো।
নিজেকে আরেকবার জিজ্ঞেস করো, তুমি কি প্রশ্নে শান্তি পাও, না উত্তরে? বিজ্ঞানী হওয়া মানে উত্তরের শেষে থামা না, নতুন প্রশ্নের দিকে হাঁটা। যদি প্রশ্নে তোমার চোখ জ্বলে ওঠে, যদি সমস্যায় তুমি ভয় না পেয়ে কৌতূহল পাও, তবে বুঝো, তুমি ঠিক পথেই আছ।
এই লেখাটা কোনো পরামর্শ না, এটা আয়না। এই আয়নায় তুমি যা দেখছ, সেটাই সত্য। যদি দেখো, তুমি ভয় পাও, তাতেও দোষ নেই। ভয় দিয়েই সাহস তৈরি হয়। কিন্তু যদি দেখো, তুমি কেবল ডিগ্রি চাইছ, জ্ঞান নয়—তখন থামো। এখনই থামো। নিজেকে বদলাও, নইলে স্বপ্নটাই বদলাও।
একদিন, বছর পনেরো পরে, তুমি হয়তো কোনো হাসপাতালে, কোনো ল্যাবে, কোনো ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ এসে বলবে, “আপনি না থাকলে আমি আজ এতোদূর আসতাম না।” সেই মুহূর্তই হবে তোমার সব উত্তর।
বিজ্ঞানী হওয়া মানে সফল হওয়া না, বিজ্ঞানী হওয়া মানে দরকার হওয়া।
আর তুমি কি দরকার হতে চাও?

Leave a comment