বই আলোচনা

বিজ্ঞানী আবিষ্কারের যুক্তি – কার্ল পপার

Share
Share

বিজ্ঞান একটি ধারাবাহিক এবং অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, যা আমাদের জ্ঞানের সীমারেখা একের পর এক প্রসারিত করে। কিন্তু এই বিশাল অবদানগুলি কিভাবে আসে? বিজ্ঞান কিভাবে বিকাশ লাভ করে, এবং কোন তত্ত্বগুলি বিজ্ঞান হিসেবে গৃহীত হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে, ২০শ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক কার্ল পপার তাঁর ‘বিজ্ঞানী আবিষ্কারের যুক্তি’ নামক বইয়ে একটি নতুন ধারণা তুলে ধরেন—‘ফলসিফায়েবলিটি’ বা তত্ত্বের পরীক্ষাযোগ্যতা। পপার তার তত্ত্বের মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি, তত্ত্বের পরিবর্তনশীলতা এবং তার অভ্যন্তরীণ জটিলতা নিয়ে এক নতুন আলোকপাত করেন। আজকের বিজ্ঞানী সমাজে পপারের ধারণা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কিভাবে বিজ্ঞানে তত্ত্ব প্রমাণিত হয় বা খারিজ হয়ে যায়, এবং বিজ্ঞানের প্রকৃতি কি তা বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।

পপার যে তত্ত্বের মূল ভিত্তি তুলে ধরেন, তা হলো পরীক্ষাযোগ্য তত্ত্বের গুরুত্ব। তিনি বলেন, কোনও তত্ত্ব যদি পরীক্ষায় খারিজ হতে না পারে, তাহলে সেটি বিজ্ঞান নয়। এর মানে হলো, কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে প্রকৃতির সাথে সঙ্গতি পরীক্ষা করতে হবে, এবং সেই পরীক্ষা যদি তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে খারিজ করা যাবে। এর বিপরীত দিকে, যে তত্ত্বগুলি পরীক্ষায় অটুট থাকে, সেগুলো বিজ্ঞানী সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়। এর মাধ্যমে, পপার বিজ্ঞানকে একটি অবিচল এবং নমনীয় কাঠামো হিসেবে তুলে ধরেন, যেখানে নতুন তত্ত্ব এবং ধারণা নিয়মিত পরীক্ষা এবং সংশোধনের মধ্যে দিয়ে আসে। এটি বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে, যেখানে তত্ত্বগুলো একে অপরকে পরীক্ষায় উৎরাতে গিয়ে আরও নিখুঁত হয় এবং জ্ঞান স্থির থাকে না, বরং সর্বদা পরিবর্তনশীল থাকে।

পপারের তত্ত্ব শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি আমাদের চিন্তাভাবনার পদ্ধতিও নতুন করে সাজায়। তিনি যুক্তি দেন, বিজ্ঞান কখনোই পুরোপুরি চূড়ান্ত হতে পারে না। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে নতুন নতুন তথ্য এবং পরীক্ষা তত্ত্বগুলিকে আরও শুদ্ধ করে তোলে। এই ‘ফলসিফায়েবল’ তত্ত্বগুলির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা একে অপরের কাজের ভিত্তিতে পরীক্ষা এবং সংশোধন করতে সক্ষম হন, যা বিজ্ঞানকে একটি নির্দিষ্ট পথের দিকে পরিচালিত করে। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন এবং অগ্রগতির মধ্যেই বৈজ্ঞানিক কাজের প্রকৃত সাফল্য নিহিত।

এটি যে শুধু বিজ্ঞানের জন্যই প্রযোজ্য তা নয়, বরং এর প্রভাব সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়ে। পপার তার তত্ত্বে বিজ্ঞানী এবং সমাজের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরেন, যেখানে তিনি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলিকে শুধুমাত্র বাস্তবতার প্রতি প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং তা কীভাবে সমাজে পরিণত হয়, কীভাবে বিজ্ঞানীদের কাজ ধীরে ধীরে সমাজে প্রবাহিত হয়, তা দেখান। উদাহরণস্বরূপ, নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পর, তাতে সংশ্লিষ্ট সমাজ বা জনগণের মনোভাব কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে, পপার মনে করেন যে বিজ্ঞানী সমাজের সদস্য হিসেবে তাদের কাজের ফলাফলগুলোর প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, এবং এটি সমাজের উন্নয়নে কিভাবে অবদান রাখবে, সেটি এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত।

পপারের এই চিন্তাধারা আমাদের সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করায়। তার ধারণা অনুযায়ী, বিজ্ঞান কোনো একক, অটুট সত্য নয়, বরং এটি একটি ক্রমবর্ধমান এবং উন্নত ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা নিজেদের পরীক্ষা, সংশোধন এবং পুনঃমূল্যায়নের মাধ্যমে অগ্রসর হয়। তিনি যা বলেছিলেন, তা হলো যে বিজ্ঞানে কোনো তত্ত্বের সত্যতা সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হওয়ার আগে তা বারবার পরীক্ষিত হতে হবে এবং তার ফলস্বরূপ তা আরও শুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে। এই প্রক্রিয়া সব সময় চলতে থাকে এবং বিজ্ঞানের প্রকৃতি হিসাবে এই অটুট প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনা এবং সমাজে জ্ঞানের গঠনকে আকৃতি দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে কিংবা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে পপারের এই তত্ত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি কেবল একটি তত্ত্বের পরীক্ষাযোগ্যতা যাচাই করতে বলেননি, বরং পুরো বৈজ্ঞানিক সমাজের কাঠামো এবং গবেষণার মূল্যায়নকেও এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছেন। তিনি বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে আরো শক্তিশালী এবং সুনির্দিষ্ট করেছেন। বিজ্ঞানী হিসেবে আমাদের কাছে যে সব তত্ত্ব থাকে, তার সবগুলোই যদি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচাই না হয়, তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

পপারের দর্শন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটি নির্ভরযোগ্য ও শুদ্ধ ভিত্তি প্রদান করে। যখন একটি তত্ত্ব পরীক্ষায় ফেল করে, তখন তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞান হেরে গেছে, বরং এটি বিজ্ঞানীকে আরও উন্নত এবং নিখুঁত তত্ত্ব খোঁজার দিকে পরিচালিত করে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিজ্ঞান প্রকৃতিতে যে পরিবর্তন আনে, তা আমাদের সমাজের চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। বাস্তবে, বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানকে প্রসারিত এবং আরও গভীর করে তোলে।

পরিশেষে, ‘বিজ্ঞানী আবিষ্কারের যুক্তি’ আমাদের শিখিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান কোনো একক গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান পথ, যেখানে তত্ত্বগুলি বারবার পরীক্ষিত হয় এবং শুধুমাত্র তাদের যা সত্য প্রমাণিত হয়, তা-ই ভবিষ্যতে নতুন ধারণা, গবেষণা এবং উন্নত প্রযুক্তির জন্ম দেয়। পপার তার তত্ত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞানের গতি এবং ভবিষ্যত গবেষণার কাঠামোকে পুনর্গঠন করার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন, যা আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যত বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রা অনুপ্রাণিত করতে সহায়ক হবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org