সম্প্রতি বিজ্ঞানী ডট অর্গ-এর আয়োজিত এক আলোচনায় তরুণ গবেষক এবং আরএমআইটি ইউনিভার্সিটি (মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া)-এর পিএইচডি শিক্ষার্থী মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম পার্থ তাঁর গবেষণা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে মূল্যবান কথোপকথন করেছেন। ওই আলোচনায় প্লাস্টিক দূষণ ও পরিবেশগত প্রভাব, জৈবপ্লাস্টিকের ব্যবহার এবং বর্জ্যপানি পুনর্ব্যবহার বিষয়ক গবেষণা, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই আলোচনা বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক, যেখানে মঞ্জুরুল তাঁর শিক্ষাগত পথচলা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছেন।
শিক্ষা ও গবেষণার পথচলা
মোঃ মঞ্জুরুল ইসলামের শিক্ষাজীবনের শুরু বাংলাদেশেই। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষাজীবনের শেষদিকে তাঁর আগ্রহ ছিল পলিমার নিয়ে গবেষণা করার। কিন্তু বাস্তবে তিনি যে গবেষণা অভিসন্দর্ভ শুরু করেন তা ছিল পরিবেশ প্রকৌশল ঘরানার – কারণ, তাঁর নির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক সে সময় পলিমারের গবেষণা থেকে সরে এসে পরিবেশমুখী গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। প্রথমে বিষয়টির মঞ্জুরুলের কাছে কিছুটা হতাশাজনক মনে হয়েছিল, তবে তিনি পরবর্তীতে উপলব্ধি করেন যে এই পরিবর্তন তাঁর জন্য আশীর্বাদই হয়ে উঠেছে। পরিবেশসংক্রান্ত গবেষণা—বিশেষত বর্জ্যপানি পরিশোধন—বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাহিদাসম্পন্ন একটি ক্ষেত্র, এবং এই ক্ষেত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান ভবিষ্যতে বহুমূল্য সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
উচ্চশিক্ষার পরবর্তী পর্বে মঞ্জুরুল বিদেশের পথে যাত্রা করেন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি বিদেশে গবেষণার সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। প্রস্তুতির শুরুতেই তিনি আইএলটিএস পরীক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং যথাসম্ভব গবেষনাপত্র প্রকাশের প্রচেষ্টা চালান। তিনি জানান যে, প্রথম স্বীকৃতিটি পেতে তাঁকে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি ইমেইল বিভিন্ন অধ্যাপকের কাছে পাঠাতে হয়েছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অধ্যাপকের কাছে থেকে পজিটিভ উত্তর পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ পেতে ব্যর্থ হন। অবশেষে দক্ষিণ কোরিয়ার হানিয়াং ইউনিভার্সিটিতে পরিবেশ প্রকৌশলে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পান ২০২০ সালে, কিন্তু কোভিডের জন্য ভিসা বন্ধ থাকায়, একটি সেমিস্টার অনলাইনে শেষ করে অবশেষে ২০২২ সালে কোরিয়ায় পাড়ি জমান। তবে কোরিয়ায় ছয় মাস কাটানোর পর তিনি সেখানে বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হন – ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বাধা, ল্যাবের কঠোর পরিবেশ ইত্যাদি কারণে স্বচ্ছন্দ বোধ করছিলেন না। মঞ্জুরুল সবসময় থেকেই গবেষণার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে পছন্দ করতেন এবং কোরিয়ায় থাকতে থাকতেই তিনি নতুন করে আইএলটিএস দেন এবং নতুন উদ্দমে আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আবেদন করতে থাকেন। সেই সাথে পাবলিকেশন বাড়াতে থাকেন, যা তার স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। অবশেষে ২০২৩ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণা করার সুযোগ লাভ করেন এবং রয়েল মেলবোর্ন ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (আরএমআইটি) তে পিএইচডি ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে একবাক্যে অন্য কাউকে তাঁর প্রজেক্ট বা বিভাগ সম্পর্কে বুঝিয়ে বলা কিছুটা দুষ্কর। এই জটিলতার কারণ-তাঁর বিভাগ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, কাজের ক্ষেত্র পরিবেশ প্রকৌশল আর পূর্বশিক্ষা রসায়ন প্রকৌশল; সব মিলিয়ে এটি বিভিন্ন শাখার মিশ্রণে সমৃদ্ধ এক গবেষণা। এই পরিস্থিতিকে তিনি হাস্যচ্ছলে “যেন এক জগাখিচুড়ি অবস্থা” বলে উল্লেখ করেন।
প্লাস্টিক দূষণ ও পরিবেশের চ্যালেঞ্জ
আলোচনায় প্লাস্টিক দূষণের বর্তমান অবস্থা নিয়ে মঞ্জুরুল গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সর্বত্র প্লাস্টিকের উপস্থিতি; তিনি উল্লেখ করেন, দৈনন্দিন ব্যবহৃত সামগ্রীর হয়তো ৭৫-৮০% কোনো না কোনোভাবে প্লাস্টিকজাত। প্লাস্টিকের বিপুল ব্যবহারের পর উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় সঠিক বর্জ্যব্যবস্থাপনার অভাব গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করছে। ব্যবহারের পর বহুলাংশে প্লাস্টিক সরঞ্জাম যথেচ্ছভাবে ফেলে দেওয়া হয়, যা শেষমেশ পরিবেশেই ফিরে আসে। প্লাস্টিক নিজে খুব টেকসই ও অপঁচনশীল (non-biodegradable) হওয়ায় তা মাটিতে অবিকৃত অবস্থায় বহু বছর রয়ে যায়। পচন বা পূর্ণ অবক্ষয় না হলেও সময়ের সাথে সাথে প্লাস্টিক ক্ষয়ে ক্ষয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক নামে অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন যে এই সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা এখন কেবলমাত্র মাটি ও পানি নয়, বায়ুমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়ছে – সাম্প্রতিক গবেষণায় বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে উদ্ভূত এই মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন ধরনের বিপজ্জনক হুমকি তৈরি করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকল্প উপাদান দিয়ে প্রচলিত প্লাস্টিককে প্রতিস্থাপনের উপায় খোঁজা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। মঞ্জুরুল উল্লেখ করেন যে কোভিড-১৯ মহামারীকালে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের (যেমন মাস্ক, পিপিই) ব্যবহার বিপুল পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল; এর ফলে মহামারীর পর প্লাস্টিক বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হয়েছে। এমনকি এই বিষয়ের উপর তাঁর একটি রিভিউ পেপারও রয়েছে উচ্চমানের জার্নালে। প্লাস্টিকের এই সর্বব্যাপী সমস্যার সমাধানে পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর বিকল্প নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়ে।
জৈবপ্লাস্টিক: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
মঞ্জুরুলের গবেষণার একটি প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে জৈবপ্লাস্টিক এবং এর জীবনচক্র বিশ্লেষণ (লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট)। ঐ আলোচনা থেকে জানা যায় যে প্লাস্টিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব জৈবপ্লাস্টিক ব্যবহার একটি সম্ভাবনাময় সমাধান, তবে এর বাস্তব প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে পলিল্যাকটিক অ্যাসিড (PLA) এর কথা ধরা যায়, যা একটি বহুল আলোচিত বায়োপলিমার। PLA জৈব উপাদান থেকে তৈরি হওয়ায় একদিকে এটি প্রথাগত প্লাস্টিকের তুলনায় অনেক কম ক্ষতিকর; যথোপযুক্ত পরিবেশ পেলে PLA যেমন মাটিতে মিশে পচে যেতে পারে, তেমনি এটি তৈরির কাঁচামাল আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে (যেমন ভুট্টা বা আখের উৎপাদিত চিনি থেকে) — ফলে জ্বালানি হিসেবে সীমিত ফসিল ফুয়েলের উপর নির্ভরতা কমায়। অন্যদিকে PLA বেশ মজবুত ও তাপ-সহনশীল; সুতরাং এটি পুনর্ব্যবহারে সক্ষম, তুলনামূলকভাবে টেকসই একটি বিকল্প। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে PLA-কে একইসাথে “টেকসই” এবং “পরিবেশবান্ধব” বলে দাবি করা হয়।
কিন্তু মঞ্জুরুল মনে করিয়ে দেন যে কোনো প্রযুক্তির মতোই জৈবপ্লাস্টিকেরও সীমাবদ্ধতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা না বুঝে একে হৈচৈ করে “সবুজ” বলে প্রচার করলে তা “গ্রিন ওয়াশ” এর শামিল হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, PLA তৈরি করতে গিয়ে যদি বিপুল পরিমাণে ভুট্টা বা আখ চাষ করা হয়, তবে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমি কমে যাবে এবং অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশে দূষণ (মাটির উর্বরতা হ্রাস, জলাশয়ে সারবাহিত দূষণের কারণে ইউট্রোফিকেশন ইত্যাদি) ঘটবে। সে ক্ষেত্রে PLA তৈরির মাধ্যমে পরিবেশের উপকার করার যে লক্ষ্য, তা পেছনের দরজা দিয়ে অন্যভাবে ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এইজন্য জৈবপ্লাস্টিকের কাঁচামাল হিসেবে খাদ্যশস্যের বদলে কৃষি-উপাত্ত বা বর্জ্যকে ব্যবহার করার দিকে বৈজ্ঞানিকরা ঝুঁকছেন। মঞ্জুরুল ব্যাখ্যা করেন যে বর্তমানে জৈবপলিমার উৎপাদনের উৎসকে তিনটি প্রজন্মে ভাগ করে দেখা হয়: প্রথম প্রজন্মে সরাসরি খাদ্যশস্য (ভুট্টা, আখ ইত্যাদি), দ্বিতীয় প্রজন্মে কৃষি-বর্জ্য (যেমন আখের ছোবড়া, ধানের তুষ ইত্যাদি), এবং তৃতীয় প্রজন্মে মাইক্রোঅ্যালগি বা ক্ষুদ্র শৈবালের মতো ভিন্নধর্মী উৎস। গবেষণার নতুন প্রবণতা হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষতি না করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের উৎস থেকে জৈবপ্লাস্টিক তৈরি করা, যাতে জমির অতিরিক্ত ব্যবহার বা খাদ্যশৃঙ্খলে ব্যাঘাত না ঘটে।
সুতরাং বাস্তবিক “টেকসই সমাধান” বলতে এমন বিকল্পকেই বোঝায় যা বহুবার ব্যবহার করা সম্ভব (Recycle), পরিবেশের জন্য নিরাপদ (eco-friendly), এবং যার সম্পূর্ণ জীবনচক্র বিবেচনায় নিয়েও সুফলটি নেতিবাচক দিককে অতিক্রম করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে কোন উদ্ভাবন সত্যিকার অর্থে টেকসই কিনা তা মূল্যায়নের সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের পরিবেশগত প্রভাব হিসাব করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের উচিত সমগ্র চিত্রটি বিবেচনায় এনে দেখতে যে প্রস্তাবিত সমাধানটি আদৌ পরিবেশবান্ধব ও বাস্তবসম্মত কিনা। জৈবপ্লাস্টিকের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো – অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও – বিশ্বব্যাপী এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে এবং ক্রমশ উন্নততর উপায় বের হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে আমরা প্রচলিত প্লাস্টিকের কার্যকর পরিবেশবান্ধব বিকল্প হাতে পাই।
বর্জ্যপানি শোধন ও সম্পদ পুনরুদ্ধার
মঞ্জুরুলের আলোচনায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল শিল্প ও নগরবর্জ্য পানির উন্নত ব্যবস্থাপনা। তিনি বলেন, প্রচলিতভাবে ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্যপানি পরিশোধন মানে হলো দূষিত পানি পরিস্কার করা, যাতে তা পরিবেশে ছাড়া যায়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা ধারণাটি আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে: এখন বর্জ্যপানিকে শুধু শোধনই নয়, বরং তার ভেতর থেকে মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধারের উৎস হিসেবেও দেখা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, শিল্পকারখানার বর্জ্য পানিতে যদি কোনো মূল্যবান ধাতু (যেমন ক্রোমিয়াম বা প্লাটিনাম) পাওয়া যায়, তবে উপযুক্ত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে শোধন প্রক্রিয়ার সময় সেই ধাতুটি পৃথক করে পুনরায় কাজে লাগানো সম্ভব – একে বলে রিসোর্স রিকভারি বা সম্পদ পুনরুদ্ধার।
তবে প্রায়োগিকভাবে এই রিসোর্স রিকভারি এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে বর্জ্যপানি থেকে উপাদান আলাদা করার প্রযুক্তির দক্ষতা (efficiency) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধরা যাক ১ কেজি পন্ড অ্যাশ-এর মধ্যে খুব কম পরিমাণে (১ গ্রাম) টাইটানিয়াম আছে, এবং অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ ৮০% পুনরুদ্ধার সম্ভব হলো। তবু মোট টাইটানিয়ামের পরিমাণ হবে মাত্র ০.৮ গ্রাম (৮০০ মিলিগ্রাম), যা আদৌ অর্থনৈতিকভাবে সংগ্রহ করার মতো নয় – তার চেয়ে আলাদা উৎস থেকে টাইটানিয়াম সংগ্রহ করাই সহজ ও সাশ্রয়ী হতে পারে। এভাবে অনেকক্ষেত্রে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার খরচ এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হতে পারে। তাই গবেষকরা নিরলস কাজ করছেন কীভাবে রিকভারি পদ্ধতিগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে তোলা যায়, যাতে কম ঘনত্বের উপাদানও সাশ্রয়ীভাবে আহরণ করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বাধা হল মৌলিক পরিশোধন প্ল্যান্টের অভাব। মঞ্জুরুল উল্লেখ করেন, অনেক শিল্পকারখানাতেই এখনো কার্যকরী ETP (Effluent Treatment Plant) নেই, আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ শিথিল। ফলে আমাদের নদীনালা ও জলাধারে সরাসরি দূষিত পানি এসে মেশে এবং পরিবেশের ক্ষতি করে। উন্নত বিশ্ব যেখানে বর্জ্যপানি শোধনকে বাধ্যতামূলক করে তাতে থেকে উপকরণ পুনরুদ্ধারের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে আগে সর্বত্র শোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই প্রথম কাজ। তিনি পরামর্শ দেন যে বাংলাদেশে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত শিল্পক্ষেত্রে কঠোরভাবে বর্জ্যপানি শোধন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা এবং এ সংক্রান্ত গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। একবার বেসিক ট্রিটমেন্ট অবকাঠামো তৈরি হলে ধীরে ধীরে উন্নত প্রযুক্তি যোগ করে সম্পদ পুনরুদ্ধারের দিকেও এগোনো যেতে পারে।
বৈজ্ঞানিক সচেতনতা ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি
মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের সাথে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার বিষয়ে উদ্দীপনা প্রকাশ করেছেন। বিজ্ঞানী ডট অর্গ এবং অনুরূপ যেসব প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞান বিষয়ে সাধারণের মাঝে সচেতনতা ছড়াচ্ছে, মঞ্জুরুল সেগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা নিয়ে কথা উঠলে অনেকেই ভাবেন বিষয়টি খুব কঠিন কিংবা রূঢ়—কিন্তু আসলে সঠিক উপায়ে উপস্থাপন করলে গবেষণার বিষয়বস্তুও সাধারণের বোধগম্য করা সম্ভব। তিনি বলেছেন, “উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা কোনো জাদুকরী বিষয় নয়; ভালোভাবে বুঝিয়ে বললে এটি আসলে নতুন জায়গায় ভর্তির মত সাধারণ একটা বিষয়।” এই মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে পারলে অনেক বেশি শিক্ষার্থী বিজ্ঞানে আগ্রহী হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
মঞ্জুরুল পরামর্শ দেন যে, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা-সংক্রান্ত কর্মশালা ও সেমিনার আরো ব্যাপকভাবে আয়োজন করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন স্টুডেন্ট রিসার্চ সোসাইটি বা বিজ্ঞান ক্লাব রয়েছে; এসব সংগঠনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান করলে আরও শিক্ষার্থীর কাছে গবেষণার বার্তা পৌঁছে দেওয়া যাবে। অনলাইন আলোচনার পাশাপাশি দেশের ভেতর স্থানীয়ভাবে কর্মশালা আয়োজন করলে ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবে, হাতে-কলমে শিখতে পারবে এবং গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত হবে। মঞ্জুরুলসহ দেশ-বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি গবেষকেরা একাজে সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত আছেন বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়ার পরামর্শ
বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশেও মঞ্জুরুল কিছু বাস্তব পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত উদাহরণ টেনে বুঝিয়েছেন যে এই পথে সাফল্য পেতে অধ্যবসায় ও ধৈর্যের কোন বিকল্প নেই। শত শত ইমেইল পাঠিয়েও শুরুতে উত্তর পাওয়া না-ও যেতে পারে, কিন্তু হাল না ছাড়ার মানসিকতা থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য সম্পর্কে জানা জরুরি: যেমন ইউরোপের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি প্রোগ্রামে আবেদন করলেই হয়, আলাদা করে অধ্যাপকের সাথে আগে থেকে যোগাযোগ না করলেও চলে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা এশিয়ার অনেক দেশে প্রফেসরের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে তার ল্যাবে স্থান পাওয়াটা মূল চাবিকাঠি। তাই যেই দেশের জন্য উপযোগী সেই কৌশল নিতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে অস্ট্রেলিয়ায় মাস্টার্স বাই রিসার্চ প্রোগ্রামে স্কলারশিপ পাওয়া প্রায় অসম্ভব, তাই কেউ সেখানে গবেষণা করতে চাইলে সরাসরি পিএইচডি বা অন্য দেশে মাস্টার্স করে তারপর পিএইচডি আবেদন করা শ্রেয়। আবার কোনো অধ্যাপক আগ্রহ দেখালেও পরিশেষে ভর্তি এবং ফান্ড মিলবে কি না তা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে – তাই সম্ভাবনা থাকলে আবেদন করে রাখা উচিত, ফলাফল যাই হোক না কেন। তিনি বলেন, “অবস্থান পাওয়া মাত্রই সব হবে, আর না পেলে জীবন বৃথা— বিষয়টা এমন নয়। সুযোগ যেখানে আছে সেখানে আবেদন করে যেতে হবে; হবে তো ভাল, না হলে অন্য রাস্তা খোলা হবে।”
গবেষণার দুনিয়ায় ক্যারিয়ার গড়তে ইচ্ছুকদের জন্য মঞ্জুরুলের পরামর্শ হল যে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রকাশনা (পেপার প্রকাশ) অর্জনের চেষ্টা করা দরকার। যদি কেউ পড়াশোনা শেষে চাকরি শুরু করেন, তবে গবেষণার সাথে যুক্ত থেকে প্রবন্ধ প্রকাশ করলে পরবর্তী উচ্চশিক্ষার আবেদনে এটি বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করবে। শিল্পকারখানায় কাজের অভিজ্ঞতাও একধরনের বাস্তব জ্ঞান দেয় যা ভবিষ্যৎ গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে। অবশ্যই লক্ষ্য যদি একাডেমিক গবেষণা হয় তাহলে প্রকাশনা ও একাডেমিক অভিজ্ঞতার মূল্য বেশি – তাই সুযোগ থাকলে এই দুটোকে ভারসাম্য রেখে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম এর সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇
উপসংহার
মোঃ মঞ্জুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার থেকে কয়েকটি মূল বার্তা উঠে আসে যা বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দরকার। প্লাস্টিক দূষণের মতো জটিল সমস্যার মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদেরই উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, তবে কোনো বিকল্পকে প্রশংসা করার আগে তার সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়ন করার মানসিকতাও অর্জন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা বা উচ্চশিক্ষার পথে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং ধৈর্য অপরিহার্য—হঠাৎ সাফল্য মিলবে না, কিন্তু অনবরত চেষ্টা চালিয়ে গেলে একসময় সঠিক সুযোগটি এসে যাবেই। তাঁর নিজ জীবনের উদাহরণ থেকেই তা স্পষ্ট হয়।
তৃতীয়ত, নিজের দেশ ও সমাজের উন্নতির কথা মাথায় রেখে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। দেশের গবেষণা খাত এখনো পিছিয়ে আছে; তাই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন দেখা উচিত।
মঞ্জুরুলের কথায়, বাংলাদেশের তরুণদের বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে পড়া দরকার এবং তারা যে অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান অর্জন করবেন, তা ফিরিয়ে এনে দেশকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখা সম্ভব। বিজ্ঞানমনস্ক এবং উদ্ভাবনী ভাবনার অধিকারী এই প্রজন্মই পারবে পরিবেশের সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে। তাঁর এ অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ ও অনুপ্রেরণামূলক কথা শিক্ষার্থীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়, যা তাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।

Leave a comment