বিজ্ঞানের পথচলা কেবল গবেষণাগার, সূত্র কিংবা তথ্যচিত্র বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই পথের গভীরে নিহিত আছে এক অবিচল নৈতিক অবস্থান, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সৎ গবেষণার প্রতিশ্রুতি। ‘On Being a Scientist’ বইটি, যা যুক্তরাষ্ট্রের National Academies of Sciences কর্তৃক রচিত, সেই অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য স্তম্ভগুলোরই নির্দেশনা দেয় যেগুলোর উপর একজন তরুণ গবেষকের পেশাগত ভিত্তি গড়ে ওঠে।
এই বইটি পড়লে বোঝা যায়, গবেষণার জগতে প্রবেশ মানে শুধু একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জন নয়; বরং এটি এক ধরনের সামাজিক চুক্তিতে প্রবেশ। একজন বিজ্ঞানী, চাইলেই তথ্য বিকৃতি করতে পারেন, কিংবা নিজের নাম সামনে রেখে অন্যের কাজ আত্মসাৎ করতে পারেন। কিন্তু বিজ্ঞান সমাজ এই অবিশ্বাস্য শক্তিকে পরিচালনার জন্য যে নৈতিক রীতিনীতির ব্যবস্থা করেছে, তারই ভিত্তি গড়ে তোলে একজন গবেষকের প্রকৃত পরিচয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে গবেষণা কার্যক্রম এখনও পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও তহবিল সংকটের মাঝে এগোচ্ছে, সেখানে এই বইটি হয়ে উঠতে পারে একটি অপরিহার্য গাইড। একাডেমিক প্রতারণা, তথ্য জালিয়াতি, কিংবা কৃতিত্ব বিতর্কের মতো বিষয়গুলো আমাদের সমাজে প্রায়শই দেখা যায়, অথচ এই বিষয়গুলোর পেছনে থাকা মনস্তত্ত্ব, কাঠামোগত চাপ ও প্রতিকার পদ্ধতি নিয়ে খুব কম আলোচনাই হয়। ‘On Being a Scientist’ বইটি এসব দিকেই আলোকপাত করে।
বিশেষত তরুণ গবেষকদের জন্য এই বইটি একটি হাতেকলমে নির্দেশিকা। যেমন, যদি কোনো গবেষক তার সহকর্মীর গবেষণায় সম্ভাব্য ভুল দেখেন, তাহলে কী করা উচিত? কিভাবে প্রকাশনার আগে তথ্য যাচাই করা যায়? গবেষণার জন্য অর্থায়ন গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা রক্ষা করা কেন জরুরি? এ ধরনের বহু জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি বইটি বাস্তব জীবনের উদাহরণ ও দৃশ্যপট সামনে এনে বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করে তোলে।
গবেষণা নীতির অন্যতম একটি দিক হলো সহলেখকতা (co-authorship)। বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্রে কে লেখক হবেন এবং কাকে বাদ দেওয়া হবে—এই বিষয় নিয়ে নীরব টানাপড়েন চলে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো সিনিয়র শিক্ষক তার ছাত্রের পুরো কাজটির উপর নিজের নাম বসিয়ে দেন। বইটিতে এই প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়েছে সততা ও সম্মানের দৃষ্টিকোণ থেকে—সহলেখকতা কেবল কৃতিত্ব নয়, বরং এটি দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশও বটে।
তবে ‘On Being a Scientist’ কেবলমাত্র সমস্যাগুলো তুলে ধরেই থেমে যায়নি। বরং এটি একটি প্রগতিশীল চেতনার জন্ম দেয়, যেখানে গবেষণাকে দেখা হয়েছে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে। বইটি বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, একজন গবেষক যখন কোনো নতুন তথ্য বা মতবাদ তুলে ধরেন, তখন তা শুধু তার নিজের অর্জন নয়, বরং মানব সমাজের জ্ঞানভান্ডারের উপর একটি স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
গবেষণার গতি আজ আগের চেয়ে অনেক দ্রুত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনোম এডিটিং, কিংবা কৌশলগত তথ্য বিশ্লেষণের মতো নতুন নতুন ক্ষেত্র আমাদের সামনে নৈতিকতার নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। আমরা কি কৃত্রিমভাবে জীব সৃষ্টি করব? গোপন ডেটা ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি কি বৈধ? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া এখন গবেষকদের নিত্যদিনের চর্চা। ‘On Being a Scientist’ বইটি এইসব জটিল প্রশ্নকে কেবল নৈতিক দ্বিধা হিসেবে না দেখে, বরং যুক্তি ও মূল্যবোধের আলোকে বিশ্লেষণ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন কোনো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চান, তখন অনেক সময় তারা জানেন না যে গবেষণার এই নৈতিক দিকগুলো কীভাবে দেখা হয়, কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা রক্ষা করতে হলে কোন কোন মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। এই বইটি সেই অন্ধকারে একটি আলোর রেখা তৈরি করতে পারে। গবেষণার পথ কেবল প্রতিভা ও পরিশ্রম নয়—এর সঙ্গে নৈতিকতা, সম্মান ও সততার এক গভীর সংযোগ রয়েছে, যা তরুণ গবেষকদের শিখতে ও ধারণ করতে হবে।
গবেষণা মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক সমাজিক প্রক্রিয়া। আমরা যখন তথ্য সংগ্রহ করি, বিশ্লেষণ করি কিংবা গবেষণাপত্র প্রকাশ করি, তখন আমরা আসলে একটি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে উঠি। এই সম্প্রদায়ে বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য যা প্রয়োজন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণ। কোনো বাইরের আইন বা তদারকির চেয়ে, একজন বিজ্ঞানীর ভেতরের নৈতিক বোধই তাঁকে সঠিক পথে রাখে। বইটির অন্যতম শিক্ষাই হলো—আত্ম-জবাবদিহিতার গুরুত্ব।
বইটিতে আলোচিত হয়েছে গবেষণা সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়টিও। যেকোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হোক তা বিশ্ববিদ্যালয়, থিঙ্কট্যাঙ্ক বা প্রাইভেট ল্যাব, সেখানে নেতৃত্বের ভূমিকাই নৈতিক সংস্কৃতি তৈরিতে মুখ্য। যদি উর্ধ্বতনরা তথ্য বিকৃতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা পলিসি লঙ্ঘনের মাধ্যমে লাভবান হন, তাহলে জুনিয়ররাও শিখে ফেলেন যে এই কাজগুলো ‘চলেই যায়’। ‘On Being a Scientist’ এই নেতৃত্বের দিকেও প্রশ্ন তোলে—নেতৃত্ব মানেই কেবল নির্দেশ দেয়া নয়, বরং নিজের আচরণ দিয়ে পথ দেখানো।
এই বইটি শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, বরং নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, এবং শিক্ষার্থীদের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গবেষণা যখন জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়, তখন সেই গবেষণার নৈতিক মাপকাঠি রক্ষা করাটা becomes a matter of national concern. বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কিংবা গবেষণার খাতকে এগিয়ে নিতে হলে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের প্রয়োজন, সেখানে গবেষণার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা একটি প্রাথমিক শর্ত।
অবশ্যই বলা যায়, ‘On Being a Scientist’ কোনো চটকদার বা জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই নয়। এটি পড়তে হয় মনোযোগ দিয়ে, বারবার ভেবে। তবে ঠিক সেই কারণেই এটি একান্ত প্রয়োজনীয়—বিশেষত তাদের জন্য, যারা কেবল ‘গবেষণা’ শব্দটির মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে চান।
যে তরুণেরা আজ ল্যাবকোট পরে, মাইক্রোস্কোপের নিচে বসে কোনো অজানা সূত্রের খোঁজ করছেন, কিংবা যারা ক্লাউডে ডেটা বিশ্লেষণ করে নতুন জ্ঞান তৈরি করছেন, তাদের জানা দরকার—তাদের কাজের প্রভাব একদিন সমাজ, দেশ ও পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন যেন সত্য ও ন্যায়ের উপর ভিত্তি করে হয়—এই আশাটুকু নিয়েই লেখা হয়েছে এই অসাধারণ বইটি। এটি শুধু একবার পড়ার জন্য নয়, বরং বারবার ফিরে যাওয়ার জন্য, নিজের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের জন্য, এবং সবচেয়ে বড় কথা, একজন প্রকৃত বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার জন্য।
এই যুগে যখন তথ্যের বন্যা বইছে, তখন সততা ও নৈতিকতা যেন হারিয়ে না যায়—এই আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে রইলো ‘On Being a Scientist’। বাংলাদেশের গবেষণার নতুন প্রজন্ম যদি এই মূল্যবোধ ধারণ করতে পারে, তাহলে আগামী দিনের বিজ্ঞান শুধু বুদ্ধির নয়, নৈতিকতার শক্তিতেও উজ্জ্বল হবে।

Leave a comment