ত্রিশ বছর আগে সুইজারল্যান্ডের দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিচেল মেয়র (Michel Mayor) এবং দিদিয়ের কেলোজ (Didier Queloz) এমন একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন যা মানব সভ্যতার কল্পনা ও কৌতূহলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৯৫ সালের সেই ঘোষণা ছিল সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা প্রথম গ্রহটির আবিষ্কার। “৫১ পেগাসি বি” নামের সেই গ্রহ ছিল একধরনের “হট জুপিটার”—নিজ নক্ষত্রের চারপাশে ভীষণ দ্রুত ঘুরতে থাকা দৈত্যাকার গ্যাসীয় গ্রহ। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়, যেখানে আমরা নিজেদের সৌরজগতের বাইরে তাকাতে শুরু করি, খুঁজতে থাকি—আমাদের মতো আর কোনো গ্রহ কি কোথাও আছে?
সেই ঘোষনার পরে সময় পার হয়ে গেছে ৩০টি বছর। এ সময়ের মধ্যে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ৬,০০০-এরও বেশি এক্সোপ্ল্যানেট, আরও হাজারো গ্রহের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নাসার কেপলার ও TESS মিশন এই আবিষ্কারের পেছনে মূল চালিকা শক্তি। তিন দশক আগে যা ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য, আজ তা বিজ্ঞানের নিয়মিত সাফল্য।
এক্সোপ্ল্যানেট হলো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত অন্য যেকোনো গ্রহ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশেষত এমন এক্সোপ্ল্যানেটগুলো খুঁজছেন যা নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে (Habitable Zone) অবস্থিত। এই অঞ্চলে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল জল থাকার সম্ভাবনা থাকে, যা জীবনের জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু এই সংখ্যার ভিড়ে আসল আকর্ষণ হলো বৈচিত্র্য। কোনো গ্রহ নিজের নক্ষত্রকে এত কাছে প্রদক্ষিণ করছে যে তার এক বছর মানে পৃথিবীর কয়েকদিন। আবার কোথাও আছে “সুপার-আর্থ”—আমাদের চেয়ে বড় কিন্তু গ্যাসীয় দৈত্য নয়, নতুন ধরনের সম্ভাবনাময় গ্রহ। কোথাও আবার একাধিক গ্রহ এমনভাবে প্রদক্ষিণ করছে যে তাদের গতি যেন সঙ্গীতের ছন্দে বাঁধা। আর আছে টাটুইনের মতো যুগল নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা জগত। প্রত্যেকটি আবিষ্কার আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে যে মহাবিশ্বের স্বাভাবিকতা আসলে আমাদের কল্পনার চেয়েও বহুগুণ বিস্তৃত। চলুন দেখা যাক তেমনই কিছু গ্রহের কথা।
প্রোক্সিমা সেন্টরি (৪.২৪ আলোকবর্ষ): সূর্যের সবচেয়ে কাছের এই নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে অন্তত দুটি ছোট গ্রহ, যাদের একটি বাসযোগ্য অঞ্চলের ভেতরে। অর্থাৎ সেখানে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা আছে। এই নৈকট্যের কারণেই প্রোক্সিমা সেন্টরি আজ মানুষের আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণের প্রথম প্রার্থী। যদিও “ব্রেকথ্রু স্টারশট” প্রকল্প এখনো ব্যর্থ হয়েছে, তবে ইউরোপীয় ও আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—এই শতকের শেষ হওয়ার আগেই মানুষ সেখানে পৌঁছে যাবে।
TRAPPIST-1 (প্রায় ৩৯ আলোকবর্ষ): পৃথিবী থেকে মাত্র ১২ পারসেক দূরে অবস্থিত এই ছোট নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে সাতটি পৃথিবীর আকারের গ্রহ। এর কয়েকটি আবার বাসযোগ্য অঞ্চলেও আছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এই গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল খুঁজে দেখছে। এখন পর্যন্ত ফল তেমন আশাজনক নয়, তবে একদিন এখানেই হয়তো আমরা দ্বিতীয় পৃথিবীর চিহ্ন খুঁজে পাব।
K2-138 (প্রায় ৬২০ আলোকবর্ষ): এই সিস্টেমে ছয়টি গ্রহ নিখুঁত রেজোন্যান্সে প্রদক্ষিণ করছে। তাদের কক্ষপথের ছন্দ এমন নিখুঁত যে বিজ্ঞানীরা তা সঙ্গীতের মতো রূপান্তর করেছেন। এই সিস্টেম আমাদের শেখায় গ্রহ কীভাবে ধীরে ধীরে সুশৃঙ্খলভাবে গঠিত হতে পারে।
TOI-178 (প্রায় ২০৫ আলোকবর্ষ): পৃথিবী থেকে ৬৩ পারসেক দূরে এই সিস্টেমের ছয়টি গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধের কক্ষপথের ভেতরে সেঁধিয়ে আছে। এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে একাধিক টেলিস্কোপের সহযোগিতা ছাড়া মহাবিশ্ব বোঝা সম্ভব নয়। নাসার TESS সংকেত দিয়েছিল, ইউরোপীয় Cheops স্যাটেলাইট তা নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে শক্তি, TOI-178 তার সেরা উদাহরণ।
কেপলার-৪৭ (প্রায় ৩,৪০০ আলোকবর্ষ): এই সিস্টেমে তিনটি গ্রহ ঘুরছে যুগল নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। এর অন্তত একটি গ্রহ যুগল নক্ষত্রের ‘বাসযোগ্য অঞ্চলে’ রয়েছে। এই সিস্টেম প্রমাণ করেছে যে গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়া শুধু একক নক্ষত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। যুগল নক্ষত্রের চারপাশেও পৃথিবীর মতো গ্রহ তৈরি হতে পারে।
এই সব আবিষ্কার হয়তো সাধারণ মানুষের চোখে শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। মানুষ যখন প্রোক্সিমা সেন্টরির উদ্দেশ্যে প্রথম মহাকাশযান পাঠাবে, তখন সেই প্রযুক্তি, সেই বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং সেই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। মহাবিশ্ব অনুসন্ধান কেবল বিলাসিতা নয়, এটি প্রযুক্তি উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার শক্তিশালী মাধ্যম।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই মূল শিক্ষা। আমরা হয়তো এখনো নিজেরা মহাকাশযান পাঠাতে পারব না। কিন্তু আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাকাশ প্রযুক্তি ও ডেটা বিশ্লেষণকে নতুন করে সাজাতে পারি। কেপলার বা জেমস ওয়েবের বিশাল ডেটাসেট সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের তরুণরা চাইলে সেই ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, নতুন এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করতে পারে, আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় অবদান রাখতে পারে।
যেমন তিন দশক আগে সুইজারল্যান্ডের এক ছোট ল্যাব থেকে শুরু হয়েছিল এক্সোপ্ল্যানেট বিপ্লব, তেমনি হয়তো বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা স্টার্টআপ থেকেও শুরু হতে পারে নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আন্দোলন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছে—আমরা একা কি না। এখন সেই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর খোঁজার পথে আমরা অনেকদূর এগিয়েছি।
মহাবিশ্বের প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের শেখায়, সীমান্ত কেবল ভৌগোলিক নয়, কল্পনারও। এক্সোপ্ল্যানেটের এই ৩০ বছরের যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জগতের দরজা খোলা, শুধু তাকিয়ে দেখতে জানতে হবে। বাংলাদেশও যদি এই বৈজ্ঞানিক যাত্রায় নিজের জায়গা তৈরি করতে চায়, তবে এখনই সময় আমাদের আকাশের দিকে তাকানোর।

Leave a comment