বাংলাদেশের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীর তালিকায় জায়গা করে নেওয়া ড. মোহাম্মদ শাহিদুজ্জামান সোহেল আজ দেশ-বিদেশে পরিচিত এক নাম। জীবনের শুরুটা ছিল ব্যর্থতা ও বাঁধাবিপত্তিতে ভরা, কিন্তু অদম্য অধ্যবসায়, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজের ভাগ্য বদলে নিয়েছেন। মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময়ে তিনি জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানো-ম্যাটেরিয়াল গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক, ১২০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধের লেখক (যার মধ্যে ৩৫টির প্রথম বা যোগাযোগকারী লেখক) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত। গড়ে ৬-এর উপরে ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশিত এসব প্রবন্ধ এবং কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের “সেরা তরুণ গবেষক” পুরস্কার (২০২৩) প্রাপ্তি তাঁর উৎকর্ষের প্রমাণ。 বিশেষত পেরোভস্কাইট সৌরকোষ নিয়ে ১২ বছরের গবেষণা-অভিজ্ঞতায় তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে এনেছেন নতুনত্ব। ড. সোহেলের ব্যক্তিগত ও প্রফেশনাল জার্নির নানা বাঁক, সংগ্রাম, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং অনুপ্রেরণার গল্প আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক।
শৈশব ও শিক্ষাজীবনের চ্যালেঞ্জ
ফরিদপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া শাহিদুজ্জামান সোহেলের জীবনের প্রাথমিক অধ্যায় ছিল একেবারেই সাধারণ। তাঁর বাবা হাজী আব্দুল খালেক মিয়া ছিলেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক – সৎ ও পরিশ্রমী এক মানুষ, যিনি সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত দেখতে চেয়েছিলেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সোহেল ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলেন, কিন্তু কৈশোরে বন্ধুবান্ধবের প্রভাব আর অভিভাবকহীন পরিবেশ তাঁকে পথভ্রষ্ট করেছিল। ফরিদপুর ছেড়ে বন্ধুদের সাথে মাদারীপুরে থেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে গিয়ে পড়াশোনায় নজর হারান সোহেল। ফলাফল, ২০০১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় তাঁর বন্ধুরা সবাই অকৃতকার্য হলো, সোহেল নিজেও কষ্টে সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করলেন। এই অপ্রত্যাশিত ফলাফল সোহেলের পরিবারের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। বাবা ভেবেছিলেন ছেলে নিশ্চয়ই “স্টার মার্কস” পাবে; বাস্তবে প্রায় ফেল করতে বসা ছেলেকে দেখে তিনি হতাশ ও রাগান্বিত হন।
বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে ডাক্তার হবে। তাই ফলাফলের পরও পিতৃআদেশে সোহেল ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের কোচিংয়ে ভর্তি হলেন, কিন্তু নিজের পারফরম্যান্স সম্পর্কে সোহেল সচেতন ছিলেন – তিনি জানতেন ডাক্তারি ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়ার মতো ভিত্তি তাঁর তৈরি হয়নি। বাবার চাপ ও নিজের অনাগ্রহের মধ্যে কোচিং চলল কিছুদিন; শেষমেশ এইচএসসি-তে দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়ার খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্রুদ্ধ বাবা ঘোষণা দিলেন, “তোমার দিয়ে পড়াশোনা হবে না”। হতাশ পিতা ক্ষোভে সোহেলকে আর কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও দিতে দিলেন না। একপ্রকার জোর করেই ছেলেকে স্থানীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-সংযুক্ত রাজেন্দ্র কলেজে স্নাতকে ভর্তি করিয়ে দিলেন।
এই ধাক্কা সোহেলকে নতুন করে ভাবতে শেখাল। বাবার স্বপ্ন ভঙ্গের গ্লানি ও নিজের ভুলের ফল তাঁকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ করে তোলে – তিনি ঠিক করলেন, দেশে যতটুকু সম্ভব পড়াশোনা করবেন, কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেবেন। রাজেন্দ্র কলেজে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সোহেল লক্ষ্য ঠিক করেন যে তিনি গবেষক হবেন এবং দেশের বাইরের উন্নত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গবেষণা করবেন। লক্ষ্যপূরণের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি ইংরেজি দক্ষতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেন। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে তিনি ঢাকার ধানমন্ডিতে থেকে রাতদিন ইংরেজি চর্চা করেছেন—TOEFL, IELTS, TOEICসহ নানা পরীক্ষায় উচ্চ স্কোর অর্জন করেন (উদাহরণস্বরূপ, TOEFL iBT-তে ১২০-এর মধ্যে ১১০ এবং IELTS-এ ৭.০ স্কোর)। ভাষাগত প্রস্তুতির পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি এবং স্কলারশিপের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এর ফলস্বরূপ ২০১০ সালে মোহাম্মদ শাহিদুজ্জামান সোহেল জাপানের সুপ্রসিদ্ধ জাপান অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (JAIST)‐তে মাস্টার্স করার জন্য ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন।
জাপানে গবেষণা-যাত্রা ও কঠোর সংগ্রাম
২০১০ সালে একলা জাপানে পাড়ি দেওয়া তরুণ সোহেলের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল পাহাড়সমান। পরিবারের আর্থিক অবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে শুরুতে কোনো স্কলারশিপ ছাড়াই তাঁকে যেতে হয়। জাপানের নতুন পরিবেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি টিউশন ফি ও নিজের খরচ চালাতে তাঁকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। JAIST-এ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে মাস্টার্স কোর্সে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি স্বল্পস্কারের বৃত্তি (প্রায় সত্তর হাজার ইয়েন মাসিক) পেলেও তা দিয়ে টিউশন ও জীবনধারণ সম্ভব ছিল না। ফলে সোহেলকে একই সঙ্গে দুইটি পার্ট-টাইম কাজ করতে হতো: দিনের বেলায় ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করা এবং গভীর রাতে স্থানীয় পত্রিকা বিতরণ করা। অনেক রাত তিনি মাত্র ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার সংবাদপত্র বিলি করতে বেরিয়েছেন, তারপর বাসায় ফিরে দ্রুত খাবার সেরে সকালে ল্যাবরেটরিতে হাজির হয়েছেন। টানা কয়েক বছর চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সুযোগ তিনি পাননি, কেবল ঘুমচোখে নিজেকে চাঙা রাখতে অগণিত কাপ কফি খেয়ে কাটিয়েছেন। ঈদের দিনের মতো উৎসবেও যখন অন্যরা আনন্দ করেছেন, সোহেল নিজের লক্ষ্যপূরণে ল্যাবে কাজ করে গেছেন রাতভর।
মাস্টার্স গবেষণার জন্য সোহেল কাজ করছিলেন একটি সিন্থেটিক কেমিস্ট্রি ল্যাবে, যেখানে তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল নতুন ন্যানোপার্টিকেল সংশ্লেষণ ও তার থার্মোইলেকট্রিক উপাদান (Thermoelectric Materials) হিসেবে ব্যবহার। থার্মোইলেকট্রিক পদার্থ এমন উপকরণ, যা তাপকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারে – উদাহরণস্বরূপ গাড়ির ইঞ্জিনের অপচয় তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গবেষণার কাজের পাশাপাশি ল্যাবের কঠোর পরিবেশ সোহেলকে নতুন এক পরীক্ষার মুখোমুখি করে। তাঁর সুপারভাইজার জাপানি অধ্যাপক মাইনো সানো (Prof. Mineo Sano) ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ ও কঠোর মনের মানুষ। তিনি ছাত্রদের থেকে সেরা পারফরম্যান্স বের করে আনতে কোনো রকম ছাড় দিতেন না। সোহেলের লেখা মাস্টার্স থিসিসটি প্রফেসর সানো পরপর ১২ বার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন – প্রতিবারই খসড়া হাতে নিয়ে সামান্য ত্রুটি পেলেই মুখের ওপর “ঠিক হয়নি” বলে ফেরত দিতেন। বারবার এত সংশোধনীর চাপ সোহেলের জন্য নিঃসন্দেহে কষ্টকর ছিল, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত ত্রয়োদশ সংস্করণে গিয়ে থিসিস পেপার অনুমোদন পেল – তাও ফাইনাল প্রতিরক্ষার ঠিক আগের দিনে! প্রফেসর সানো প্রথমবারের মতো তাঁর সঙ্গে করমর্দন করে “ওয়েল ডান, কনগ্র্যাচুলেশনস” বলেছিলেন। এমন কঠোর পর্যায় পার হয়ে ২০১৩ সালে সোহেল মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, আর উপলব্ধি করেন যে এই কঠিন প্রশিক্ষণই তাঁকে গবেষণার কঠোর বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করেছে। একসময় যেই অধ্যাপকের ওপর তাঁর অভিমান হয়েছিল (কারণ নিজের গবেষণার ডেটা দিয়ে অন্য একজন সহপাঠীকে প্রবন্ধ লেখায় সাহায্য করতে হয়েছিল, যেখানে সোহেলকে নাম দেওয়া হয়েছিল মাত্র তৃতীয় লেখক), সেই অধ্যাপককেই তিনি এখন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। প্রফেসর সানো যেন কঠোর আগুনে ফেলে লোহাকে তামার মতো নমনীয় ও পরিশোধিত বানিয়েছিলেন – যার ফল শ্রুতিতে সোহেল পরে যেকোনো চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার মানসিকতা অর্জন করেন।
মাস্টার্স গবেষণার শেষ দিকে এই কঠোর অভিজ্ঞতার আর একটি ইতিবাচক দিক ছিল সোহেলের মনে নতুন উদ্দীপনা জাগানো। থিসিস নিয়ে টানা দ্বন্দ্ব এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার ঘটনা তাঁকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিল – “আমি আমার অধ্যাপকের সারাজীবনের প্রকাশনার চেয়ে অন্তত একটি বেশি প্রথম-লেখক প্রবন্ধ প্রকাশ করব।” এই তীব্র আত্মপ্রত্যয় পরবর্তী গবেষণাপথে তাঁকে অহর্নিশ প্রেরণা জুগিয়েছে।
পেরোভস্কাইট গবেষণায় নবযাত্রা
২০১৩ সালে মাস্টার্স শেষ করার ঠিক আগে সোহেল ঠিক করেন যে তিনি পিএইচডি গবেষণার জন্য বিষয় পরিবর্তন করবেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তির প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণ ছিল। সে সময়ে সৌরশক্তিতে একটি নবতর উপাদান হিসেবে পেরোভস্কাইট সোলার সেল মাত্র বিশ্বজুড়ে গবেষণা শুরু হয়েছেঃ ২০০৯ সালে জাপানের অধ্যাপক মিয়াসাকা প্রথম তরল অবস্থা পেরোভস্কাইট দিয়ে সৌরকোষ চালু করেন, ২০১২-২০১3 নাগাদ কঠিন অবস্থার পেরোভস্কাইট নিয়ে কাজ শুরু হয়। পেরোভস্কাইট হলো এক ধরনের সেমিকন্ডাক্টর ধর্মী স্ফটিক যা রুশ খনিজবিদ লেভ পারভোস্কির নামে নামকরণ করা হয়েছে। এতে জৈব (অর্গানিক) ও অজৈব (ইনঅর্গানিক) অংশের মিশ্রণ থাকে বলেই একে হাইব্রিড উপকরণ বলা হয়। পেরোভস্কাইট উপাদানের বিশেষ গুণ হলো খুব পাতলা স্তরেও এটি সূর্যের আলো প্রচণ্ড কার্যকারিতায় শোষণ করতে পারে। একটি সাধারণ সেমিকন্ডাক্টর সূর্যালোকে শোষণ করে ইলেকট্রন-হোল (ঋণাত্মক ও ধনাত্মক চার্জ) জোড়া তৈরি করে; এই চার্জকে পৃথক করে সার্কিটে প্রবাহিত করতে পারলেই সৃষ্টি হয় বৈদ্যুতিক প্রবাহ। পেরোভস্কাইটের আলোক শোষণ ক্ষমতা (extinction coefficient) সিলিকনের তুলনায় ১০ গুণ বেশি, ফলে মাত্র ন্যানোস্কেল (~ vàiশ ন্যানোমিটার) পুরু স্তরেও এটি সূর্যালোক শোষণ করে সিলিকনের তুলনায় সমপরিমাণ বা বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সিলিকন-ভিত্তিক সৌরপ্যানেলের একটি সেল সাধারণত মাইক্রোমিটার স্তরের পুরুত্ব চায়, যা ভারী ও শক্ত; বিপরীতে পেরোভস্কাইটের ন্যানোস্তরের পাতলা সেল অনেক হালকা ও নমনীয় হয়। তাত্ত্বিকভাবে একক-জংশনের পেরোভস্কাইট সোলার সেলের দক্ষতা প্রায় ৩৩% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং বিভিন্ন ব্যান্ডগ্যাপের একাধিক স্তর (ট্যান্ডেম সেল) ব্যবহার করে ৪৫% ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
এই সম্ভাবনা দেখেই সোহেল পিএইচডিতে পেরোভস্কাইট গবেষণায় ঝুঁকে পড়েন। JAIST থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ভর্তি হন এবং সৌভাগ্যক্রমে জাপান সরকারের মনবুকাগাকুশো (MEXT) স্কলারশিপ পেয়ে যান। কিন্তু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন গাইড এবং একেবারে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণা শুরু করাও সহজ ছিল না। পিএইচডির শুরুতে কয়েক মাস পর্যাপ্ত ফলাফল না আসায় তিনি কিছুটা চাপের মুখে পড়েন, তারও মাঝে ব্যক্তিগত জীবনে বড় পরিবর্তন ঘটে – ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে দেশে ফিরে তিনি বিয়ে করে আবার জাপানে গবেষণায় যোগ দেন। গবেষণার শুরুতেই ছুটি নিয়ে বিয়ে করাটা তাঁর তৎকালীন সুপারভাইজার ভালোভাবে নেননি, যা পরোক্ষভাবে সোহেলের ওপর বাড়তি প্রত্যাশা ও চাপ তৈরি করে।
গবেষণায় প্রথম আট মাস কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য না পেলেও সোহেল হাল ছাড়েননি। ল্যাবের আশেপাশে তেমন অভিজ্ঞ সিনিয়র বা বাংলা-ভাষী কেউ ছিলেন না, তাই প্রতিবেশী এক ভারতীয় তরুণ সহকারী অধ্যাপক (প্রফেসর রাম) এর কাছে তিনি অগত্যা পরামর্শ চান। ওই গবেষক সরাসরি পেরোভস্কাইটের লোক ছিলেন না বটে, তবে একজন গবেষকের সাধারণ কৌশল হিসেবে কিছু দিকনির্দেশনা দেন যা সোহেলকে নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করে। এরপর সোহেল দিনের বেলা একনাগাড়ে ল্যাবে পরিশ্রম করতেন আর গভীর রাতে পত্রিকা বিলি করার সময় মাথায় তাঁর গবেষণার সমস্যাটিই ঘুরত – কীভাবে এই নতুন উপকরণকে অবিশ্বাস্যভাবে ITO কাচের ওপর নিজেরাই গঠিত ক্ষুদ্র কণায় (ন্যানোপার্টিকেল) রূপান্তরিত হতে দেখেছেন, তার মেকানিজম কী হতে পারে। কখনো কখনো মাত্র ২-৩ ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়ে আবার ল্যাবে ছুটে গেছেন তাঁর চিন্তাগুলি পরীক্ষা করতে। প্রায় তিন মাস এভাবে রাতদিন মাথা ঘামানোর পর হঠাৎ একদিন মেকানিজমটির যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তাঁর মস্তিষ্কে উদয় হয়। ভোররাতে বাসায় দৌড়ে এসে তিনি সেই ধারণা নোট করে রাখেন এবং পরের দিন ল্যাবে গিয়ে অধীর আগ্রহে সুপারভাইজারের সাথে মিটিং করে প্রস্তাবিত মেকানিজম তুলে ধরেন। প্রফেসর প্রথমে বিমর্ষ হলেও সোহেলের বিশ্লেষণ মনোযোগ দিয়ে শোনার পর অবাক হয়ে স্বীকার করেন – উত্তরটি সঠিক। সাথে সাথেই তিনি নির্দেশ দেন এই আবিষ্কারের পেটেন্ট করতে এবং পরবর্তী গবেষণা এগিয়ে নিতে। সেই মুহূর্তটি ছিল সোহেল জীবনের টার্নিং পয়েন্টগুলোর একটি – প্রথম আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও অবদান
সোহেল ও তাঁর দলের সেই উদ্ভাবন ছিল পেরোভস্কাইট সোলার সেলে “আয়নিক লিকুইড” যোগ করার কৌশল। আয়নিক লিকুইড বলতে সহজ ভাষায় বলা যায়, ঘরের তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকা লবণ, অর্থাৎ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আইনের সমন্বয়ে গঠিত তরল পদার্থ। এই আয়নিক তরলের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে – এটি পরিবেশবান্ধব “সবুজ দ্রাবক” এবং বেশ হাইড্রোফোবিক (জলতৃপ). পেরোভস্কাইট সোলার সেল তৈরির সময় সামান্য পরিমাণ বিশেষ আয়নিক লিকুইড উপাদান যদি সলিউশনে মিশ্রিত করা যায়, তাহলে তা তৈরি হওয়া সোলার ফিল্মের অভ্যন্তরে ক্রিস্টালের স্থিতিশীলতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। পেরোভস্কাইটের বড় সমস্যা ছিল স্থিতিশীলতা – সিলিকন সোলার প্যানেল যেখানে ২০+ বছর বিদ্যুৎ দিতে পারে, প্রাথমিক পেরোভস্কাইট সেল কয়েক মাসের মধ্যেই কার্যকারিতা হারাত। সোহেলের লক্ষ্য ছিল পেরোভস্কাইট সেলের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করা এবং সহজ পদ্ধতিতে তৈরি করা। ২০১৪ সালের দিকে তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পেরোভস্কাইট পাতনে আয়নিক লিকুইড মেশানোর ধারণা বাস্তবায়ন করেন এবং জাপানে এর পেটেন্ট আবেদন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ওই সেলে মাত্র ১০% দক্ষতা অর্জিত হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ স্থিতিশীলতা আসেনি, তবে এটি ছিল ভবিষ্যতের বড় সাফল্যের বীজ।
পিএইচডি সম্পন্ন করার পর (২০১৬ সালে, তিনটি প্রথম-লেখক গবেষণা প্রবন্ধ ও একটি পেটেন্টসহ) সোহেল কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর একটি বিশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর আরেকটি পোস্টডকের জন্য তিনি জাপানেরই তোকাই ইউনিভার্সিটিতে যান, সেখানেই তাঁর গবেষণার নতুন বিস্তার ঘটে। পেরোভস্কাইটের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য আয়নিক লিকুইড সংশ্লেষিত যে ন্যানোকণাগুলো তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, সেগুলোর “Seeded Growth” কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করেন – অর্থাৎ ঐ ন্যানো-কণাগুলোকে বীজের মতো ব্যবহার করে পেরোভস্কাইট ক্রিস্টাল বাড়ানো, যাতে সেলের কর্মক্ষমতা ও স্থায়িত্ব আরও বাড়ে। ২০২1 সালে কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক পদে ফিরে আসার পরে তিনি এই কৌশলে তৈরি সেলগুলোর উপর পরীক্ষা চালান। দেখা গেল, সাধারণ পরিবেশ (বাহ্যিক আর্দ্রতা ও অক্সিজেন উপস্থিত পরিবেশ) রুমের তাপমাত্রায় ৮ মাস রাখলেও তাঁর তৈরি উন্নত পেরোভস্কাইট সেল উল্লেখযোগ্য দক্ষতা হারায়নি। এটি এক বিরাট সাফল্য – কারণ আগে এসব সেল তৈরিই হতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের গ্লাভ বক্সের ভেতরে, না হলে কয়েকদিনেই নষ্ট হয়ে যেত। সোহেলের উদ্ভাবিত আয়নিক লিকুইডের ব্যবহার ক্রিস্টালগুলিকে জলীয় বাষ্প থেকে রক্ষা করে স্থায়িত্ব দিয়েছে।
এই সাফল্যের ভিত্তিতে ড. সোহেল ঠিক করেন যে পেরোভস্কাইট প্রযুক্তিকে পরীক্ষাগার থেকে সরাসরি শিল্পউৎপাদনের স্তরে নিয়ে যাবেন। তিনি তাঁর প্রযুক্তির লাইসেন্স একটি জাপানি কোম্পানিকে হস্তান্তর করেন, যারা ১০×১০ বর্গসেন্টিমিটার আকারের পেরোভস্কাইট সোলার মডিউল নির্মাণ করে এর সম্ভাবনা যাচাই করে। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ২০২6 সালের ফেব্রুয়ারিতে ড. সোহেল তিনজন জাপানি সহকর্মী অধ্যাপকের সাথে মিলিত হয়ে একটি স্টার্ট-আপ কোম্পানি চালু করতে যাচ্ছেন – নাম NST সোলার টেকনোলজি (প্রস্তাবিত; তিন প্রতিষ্ঠাতা Nakano, Sohel, Taima – তাঁদের নামের আদ্যক্ষর থেকে NST)। এই স্টার্টআপের লক্ষ্য হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে দীর্ঘস্থায়ী সৌরপ্যানেল তৈরি ও বিতরণ করা।
ড. সোহেল যে রোল-টু-রোল (Roll-to-Roll) পদ্ধতিতে সৌর প্যানেল তৈরির কথা বলেন, তা আসলে বিশাল আকৃতির ফিতার মতো একটি স্তরে ধারাবাহিকভাবে সৌরকোষ মুদ্রণ করার প্রযুক্তি। যেমন টয়লেট পেপারের রোলের মতো এক পাশে পদার্থ লাগিয়ে গেলে ক্রমাগত কয়েক মিটার দৈর্ঘ্যের পাতলা সোলার প্যানেল তৈরি হয়ে যেতে পারে। এই প্রযুক্তি প্রচলিত সিলিকন প্যানেলের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং সস্তায় বহু পরিমাণে নমনীয় সৌরকোষ তৈরি করতে পারবে। এভাবে তৈরি করা অতিপাতলা ও নমনীয় সৌর প্যানেল অনেক নতুন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে—উদাহরণস্বরূপ, ভবনের দেয়ালে টাইলসের মতো স্থাপন করা, জানালার কাঁচে স্বচ্ছ আবরণ হিসেবে ব্যবহার করা, এমনকি ইলেকট্রিক গাড়ির উপরের অংশে প্যানেল বসিয়ে যানবাহনে একীভূত সৌরশক্তি ব্যবস্থা (Vehicle-Integrated Photovoltaics বা VIPV) হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। সিলিকন প্যানেলের ওজন ও ভঙ্গুরতার কারণে যেখানে এসব ভাবা যেত না, পেরোভস্কাইটের পাতলা ফিল্ম সেখানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভারী সিলিকন প্যানেল ছাদ থেকে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে; পেরোভস্কাইট প্যানেল ভাঙলেও ওজনহীন হওয়ায় ঝুঁকি কম। তাছাড়া ভবিষ্যতের স্মার্ট গৃহে ঘরের ভেতরের সাধারন আলোর মাত্রাতেও কাজ করতে সক্ষম এমন পেরোভস্কাইট কোষ নিয়ে কাজ চলছে, যার মাধ্যমে ইন্ডোর ডিভাইসও চলে এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তি-ব্যবস্থা গড়া যাবে।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সূর্যালোক প্রাচুর্য আছে কিন্তু জমির পরিমাণ সীমিত, সেখানে ছাদ, দেয়াল কিংবা যানবাহনের ওপরে লাগানো নমনীয় সৌরকোষ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খাতকে বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ড. সোহেলের উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব উন্মুক্ত বায়ুতে নির্মিত প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যয়বহুল ক্লিনরুম বা গ্লাভ বক্সের দরকার হবে না, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনেক বড় সুবিধা। বরং একটি সাধারণ স্পিন-কোটিং যন্ত্র দিয়েই যদি বাতাসে পেরোভস্কাইট ফিল্ম করা যায়, তবে স্বল্প পুঁজিতেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা সোলার প্যানেল তৈরিতে নামতে পারবে। অবশ্য পেরোভস্কাইট সেলেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে – যেমন উপরের জৈব স্তরটি আর্দ্রতায় সংবেদনশীল বলে প্যানেলকে ভালভাবে এনক্যাপসুলেট বা আবদ্ধ করে সিল করে দিতে হয় যাতে পানি-বাষ্প ঢুকতে না পারে। ড. সোহেলের দল প্লাস্টিক ল্যামিনেশন করে এই সুরক্ষা দেওয়ার প্রযুক্তিতেও উন্নতি এনেছে। সঠিকভাবে আবদ্ধ করা হলে প্যানেলে ধুলাবালিও কম জমে এবং কর্মক্ষমতা বহুদিন স্থায়ী হয়।
মেন্টর ও বিশ্বজোড়া গবেষণা-সহযোগিতা
জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে সাফল্য অর্জনের পথে সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা (mentorship) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ড. শাহিদুজ্জামান সোহেলের যাত্রায় কয়েকজন অনুপ্রেরণাদায়ী মেন্টরের কথা বিশেষভাবে উঠে আসে। প্রথমেই বলতে হয় ড. জামাল উদ্দিনের কথা—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Coppin State University–এর অধ্যাপক ও ন্যানোটেকনোলজি সেন্টারের পরিচালক। বাংলাদেশি গবেষক সমাজে ড. জামাল সোহেলের অন্যতম পথপ্রদর্শক ছিলেন; গবেষণার পথে বিভিন্ন সময়ে তিনি সোহেলকে উৎসাহ ও সহায়তা দিয়েছেন। কৃতজ্ঞচিত্তে সোহেল স্বীকার করেন যে নিয়মিত পরামর্শ ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে জামাল স্যার তাঁকে বৃহত্তর লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনের সাহস জুগিয়েছেন।
পিএইচডির শুরুর দিকে কানাজাওয়ায় সোহেলের ভাগ্য ভালো ছিল যে সেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইসমাইল নামের এক ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন (বর্তমানে জাপানের ফুকুশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত)। ইসমাইল ভাই একবছর সোহেলের পাশের ল্যাবে থেকে প্রতি সন্ধ্যায় তাঁকে ডেকে গবেষণা প্রবন্ধ লেখার কৌশল শিখিয়েছেন। গবেষণা-দুনিয়ায় লেখালেখি ও প্রকাশনার হাতেখড়ি পাওয়ার এটিই ছিল মোক্ষম সুযোগ। একই সময়ে আরেকজন অভিজ্ঞ গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোশাররফ জাপানে এক সপ্তাহের জন্য আসেন। ইসমাইল ভাইয়ের পরামর্শে সোহেল সে এক সপ্তাহ মোশাররফ ভাইয়ের সঙ্গ ছেড়ে এক মুহূর্তও দূরে থাকেননি – গবেষণা পরিকল্পনা, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রবন্ধের ভাষা প্রভৃতি বিষয়ে অমূল্য শিক্ষা নেন। সোহেল মজা করে বলেন, এই দুই গুরু তাকে এতটাই শিখিয়েছেন যে তাঁর নিজের লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা আজ তাদের দু’জনের মোট প্রকাশনার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, প্রফেসর ইসমাইল ও মোশাররফ যে জ্ঞান-দীক্ষা দিয়েছেন, তার বদৌলতে সোহেল এখন পর্যন্ত ৩৫টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম বা যোগাযোগকারী লেখক হয়েছেন, যা একজন উদীয়মান গবেষকের জন্য অসামান্য অর্জন।
পোস্টডক গবেষণার সময় ড. সোহেলের জীবনে আরেকটি বড় বাঁক আসে যখন জাপানে পেরোভস্কাইট সেলের জনক প্রফেসর মিয়াসাকা এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তোকাই ইউনিভার্সিটিতে একটি সেমিনারে সোহেলের উপস্থাপনা দেখে মিয়াসাকা এতটাই মুগ্ধ হন যে তাঁকে নিজের ল্যাবে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। মিয়াসাকার সঙ্গে কাজ করে এবং সহ-লেখক হিসেবে দু’টি প্রবন্ধ প্রকাশ করে সোহেল আন্তর্জাতিক গবেষণামহলে আরও পরিচিতি লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি স্বল্প সময়ের জন্য টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়েও ভিজিটিং গবেষক ছিলেন, যা তাকে জাপানের বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে জায়গা করে দেয়।
ড. সোহেলের গবেষণা সহযোগিতার জাল আজ বিশ্বজোড়া। তিনি একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথে জোট বেঁধে কাজ করছেন, অন্যদিকে হংকং বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের গবেষকদের সাথেও প্রকল্প চালাচ্ছেন। বাংলাদেশী গবেষকদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মাইনুল ইসলামের সাথে তাঁর সম্প্রতি একটি প্রজেক্ট শুরু হয়েছে। নিজের দেশ থেকে দূরে থাকলেও সোহেল বাংলাদেশের মেধাবীদের বিশ্বমানের গবেষণায় সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন – উদাহরণস্বরূপ, তিনি আমেরিকার প্যানাসনিক গবেষণা ল্যাবে কর্মরত ড. ইসমাইল (অন্য একজন, এআইইউবির সাবেক শিক্ষক) এবং মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে কাজ করা অধ্যাপক আকতারুজ্জামানের সঙ্গে মিলে যৌথ প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এই বৈচিত্র্যময় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পেছনে সোহেলের দৃষ্টিভঙ্গি হলো: বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা না থাকলে বড় সাফল্য সম্ভব নয়। তাই একজন নতুন গবেষককে শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
স্বীকৃতি ও সাফল্যের মাইলফলক
ড. শাহিদুজ্জামান সোহেলের ক্যারিয়ারের উল্লেযোগ্য অর্জনগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণা-প্রকাশনায় তাঁর উত্কর্ষ্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে গর্বিত করেছে – ২০২১ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের তালিকায় তিনি অন্তর্ভুক্ত হন। ২০২৩ সালে জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গবেষণায় অসাধারণ সাফল্যের জন্য Encouragement Award (Best Young Researcher Award) লাভ করেন, যা সে প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি হিসেবে বিরল সম্মান। মাত্র এক দশকের মধ্যে তাঁর প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধসংখ্যা ১২০-এর বেশি, যার মধ্যে ৩৫টিরও অধিক প্রবন্ধে তিনি প্রথম ও যোগাযোগকারী লেখক (First & Corresponding Author)। বিশেষ করে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (ACS) এবং এলসেভিয়ারসহ শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনী থেকে তাঁর প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়েছে – যেমন ACS Sustainable Chemistry & Engineering, এবং উচ্চ ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টরের Nano Letters জার্নালে তিনি ফলপ্রসূ গবেষণা নিবন্ধ দিয়েছেন। ২০১৮-২০২2 সময়কালে তিনি প্রতি বছর গড়ে ৮-১০টি করে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন, যা যে কোনো আন্তর্জাতিক মানের গবেষকের জন্যই ঈর্ষণীয় অর্জন। পিএইচডির শেষে তাঁর ঝুলিতে যেমন ছিল একটি জাপানি পেটেন্ট, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে তিনি একটি আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আবেদনও দাখিল করেছেন পেরোভস্কাইটের নতুন প্রযুক্তির জন্য।
একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে ড. সোহেলের অবস্থানও ক্রমোন্নতির দৃষ্টান্ত। পিএইচডির পর পর পর দুইটি পোস্টডক সম্পন্ন করে তিনি বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্টে কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হন। প্রায় ১০টি প্রথম-লেখক প্রবন্ধ প্রকাশের শর্ত পূরণ করে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। কয়েকবছর গবেষণা ও প্রকাশনায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনিওর (চূড়ান্ত মেয়াদী) সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়েছেন। এই পদোন্নতিটি নিশ্চিত করেছে যে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর স্থায়িত্ব ও নেতৃত্ব স্বীকৃত। বর্তমানে তিনি কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে প্রায় ২৫ জন গবেষক (পোস্টডক্টরাল ফেলো, পিএইচডি, মাস্টার্স ও অনার্সের ছাত্রছাত্রী মিলিয়ে) পেরোভস্কাইট সোলার সেল নিয়ে গবেষণা করছেন। বাংলাদেশী তরুণ হিসেবে জাপানের মাটিতে নিজের স্বাধীন গবেষণা দল গঠন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো অগ্রগামী ক্ষেত্রে অবদান রাখা নিঃসন্দেহে এক বড় সাফল্য।
শিক্ষার্থীদের জন্য ড. সোহেলের পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা
ড. শাহিদুজ্জামান সোহেলের জীবনের গল্পটি যেমন সংগ্রামের, তেমনি তা শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যেসব শিক্ষা পেয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মঞ্চে তা শেয়ার করেছেন ভবিষ্যৎ গবেষকদের উদ্দেশ্যে। তাঁর মতে সফল গবেষক হতে চাইলে নিজেকেই নিজেদের পথ তৈরি করতে হবে – বাইরের তাগিদ বা অনুকূল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করলে চলবে না। সোহেল সরাসরি বলে থাকেন: “এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় আপনাকে কেউ হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবে না। আপনার লক্ষ্য আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেই পদক্ষেপ নিতে হবে।” প্রথমে স্থির করুন, আপনি কী হতে চান – যদি গবেষক হওয়া লক্ষ্য হয়, তাহলে সেই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মনে প্রাণে গ্রহণ করতে হবে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক বিষয় বা গবেষণাক্ষেত্র নির্বাচন। যে ফিল্ডে কাজ করবেন, তা সময়োপযোগী ও নিজের আগ্রহের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা যাচাই করতে হবে। কোনো বিষয়ে নামার আগে তার সাম্প্রতিক গবেষণা প্রবন্ধ, উদ্ভাবন ইত্যাদি ভালো করে পড়াশোনা করে নিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে আপনার আত্ম-অনুপ্রেরণা থাকতে হবে – অন্য কেউ এসে “পুশ” করে যাবে না।
গবেষণাক্ষেত্র নির্ধারিত হলে পরবর্তী ধাপ হলো সেই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও তাঁদের কাছ থেকে শেখা। আজকের ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও পেশাগত নেটওয়ার্ক—যেমন লিংকডইন—ব্যবহার করে খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের আপডেট অনুসরণ করা সম্ভব। তাঁদের প্রকাশনা ও কাজের ধরণ দেখে নিজেকে গড়ে তুলুন। তবে যোগাযোগের ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে হবে আপনাকেই—সহায়তা চান, পরামর্শ চান; দেখবেন অনেকেই সানন্দে সাড়া দেবেন। কিন্তু কেউ নিজে থেকে এসে সুযোগ করে দেবে, তা আশা করা উচিত নয়; তাই নিজেকেই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
বিদেশে গবেষণা করতে আগ্রহী বাংলাদেশের তরুণদের প্রতি ড. সোহেলের বিশেষ পরামর্শ হলো ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা উন্নয়ন করা। তিনি নিজের জীবনের উদাহরণ টেনে বলেন, ভিন্ন দেশে মেধার পরিচয় দেওয়ার প্রথম শর্ত হলো ভাষাগত যোগাযোগ দক্ষতা – আপনি কত ভালো ভাবনা চিন্তা করেন তা উপস্থাপন করতে না পারলে কেউ বুঝতে পারবে না। কাজেই ছাত্রজীবনে সময় থাকতেই TOEFL/IELTS-এর মতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে স্পিকিং, রাইটিং, রিডিং, লিসনিং সবদিকেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। শুধু কথোপকথন নয়, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ পাঠ ও লেখা অনুশীলনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সোহেল পরামর্শ দেন, ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ হওয়ার পরই বিদেশি অধ্যাপকদের সঙ্গে ইমেইল যোগাযোগ বা গবেষণাপ্রস্তাব পাঠানোর কাজে হাত দেওয়া উচিত, নইলে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
গবেষণার পথে কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মিত অধ্যবসায় এর বিকল্প নেই – ড. সোহেলের নিজের জীবনই তার প্রমাণ। তিনি ছাত্রদের উদ্দেশে মজা করে বলেন, “আমরা তরুণ মানুষ, এখন ঘুম কমালে চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে ভয় পাবার কিছু নেই। আমি নিজে টানা সাত বছর চার ঘণ্টা করে ঘুমিয়ে কাজ করেছি – তাতে কোন ক্ষতি তো হয়নি, বরং সফল হয়েছি।” অবশ্যই এটা বলতে গিয়ে তিনি পরিমিতিবোধও রাখেন; কিন্তু মূল কথাটা হলো, লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে আরামের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। অনেক ছাত্রকে দেখা যায় পরীক্ষার আগমুহূর্তে রাত জেগে পরিশ্রম করে, এরপর দীর্ঘ সময় ঢিলে দেন—এভাবে অনিয়মিত চেষ্টায় কোনো দিন বড় কিছু করা যায় না। ড. সোহেলের মতে, গবেষণায় ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: প্রতিদিন নিয়ম করে পড়া, ল্যাবে সময় দেওয়া, ভাবনাচিন্তা করা—এসবের মাধ্যমেই আইডিয়া আসে, মেধার বিকাশ হয়। “আজ ছয় ঘণ্টা পড়লাম, কাল দশ ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটালাম”—এভাবে চললে হবে না।নিজের একটি রুটিন ও কর্মশৃঙ্খলা তৈরি করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ড. সোহেল তরুণদের মনে করিয়ে দেন যে নিজেকে কখনো কম মূল্যায়ন করা যাবে না, আবার অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতেও ভোগা যাবে না। তিনি বলেন, “তুমি বাংলাদেশে হয়তো ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়ছ, পরীক্ষায় ভালো করছ, তাই নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে হচ্ছে। কিন্তু একবার দেশের বাইরে পা দিয়ে দেখো – সেখানে নিজের অবস্থানটা বুঝতে পারবে। তখন উপলব্ধি হবে বিশ্বমানের জায়গায় পৌঁছাতে তোমাকে আরও কতখানি উন্নতি করতে হবে।” তাই সাফল্যে আত্মতুষ্ট না হয়ে নিরন্তর শিখে যাওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। একই সঙ্গে ব্যর্থতা বা দুর্বলতার কারণে হতোদ্যম হওয়া চলবে না। বরং ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে নিতে হবে। সোহেল নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এইচএসসি-তে ভীতিংকর ফল, বাবার তিরস্কার, প্রাথমিকে সাধারণ পরিবার থেকে অভিজাত পরিবারে বিয়ে – প্রতিটি ধাক্কাই তিনি মোটিভেশন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। পরিবারের সম্মান রক্ষা এবং নিজের পরিচয় গড়তে না পারলে তিনি নিজের স্ত্রীর উচ্চপদস্থ ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না – এই চিন্তাও তাঁকে পীড়া দিয়ে বেশি কাজ করিয়েছে। ফলে সেই পীড়া তিনি কাজে রূপান্তরিত করেছেন নিঃশব্দে নিজেকে প্রমাণ করে। তাঁর স্পষ্ট কথা – “ব্রিলিয়ান্ট বলে কেউ আগে থেকে থাকে না; প্রচেষ্টায়ই ব্রিলিয়ান্স আসে।” প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ সবাইকে মেধা দিয়েছেন, কিন্তু অনেকেই তা ব্যবহার না করায় কাজে লাগাতে পারেন না – যিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজস্ব ক্ষমতাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগান, তিনি যেকোনো বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে পারেন।
ড. শাহিদুজ্জামান সোহেল এর সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇
উপসংহার
ড. মোহাম্মদ শাহিদুজ্জামান সোহেলের জীবনকাহিনী বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এক অত্যন্ত মূল্যবান অনুপ্রেরণার উৎস। পরিবার থেকে পাওয়া শিক্ষা ও মূল্যবোধ, ব্যর্থতা থেকে পাওয়া শিক্ষা, নিজস্ব প্রচেষ্টায় লক্ষ্য স্থির করা, এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অক্লান্ত পরিশ্রম – এই উপাদানগুলোর সমন্বয়ে কিভাবে একজন মানুষ শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছাতে পারেন তার বাস্তব উদাহরণ তিনি। সোহেল দেখিয়েছেন যে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্ম-বিশ্বাসের জোরে কি অকল্পনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব – চাইলেই একজন সাধারণ ছাত্রও বিশ্বমানের বিজ্ঞানীর কাতারে পৌঁছে যেতে পারে। তাঁর গবেষণায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যেমন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তেমনি তাঁর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা বদলে দিতে পারে আমাদের আগামী প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি। ড. সোহেল আমাদের শিখিয়েছেন—স্বপ্ন হতে হবে বড়, লক্ষ্য থাকতে হবে পরিষ্কার, পরিশ্রম করতে হবে অবিরাম, আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৃহত্তর জগতের সঙ্গে রাখতে হবে নিরন্তর সংযোগ। পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু আজকের বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া তরুণের মধ্যে যদি সোহেল-এর মতো জিদ ও জিজীষা থাকে, তবে আগামী দিনের বৈশ্বিক গবেষণা-মানচিত্রে বাংলাদেশ আরও উজ্জ্বল অবস্থান গ্রহণ করবেই।

Leave a comment