চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

বয়স বাড়ার মোড়: মানবদেহে ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে ঘটে এক নাটকীয় পরিবর্তন

Share
Share

নিউজ ডেস্ক, বিজ্ঞানী অর্গ | [email protected]

বয়স বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে আমরা সাধারণত বয়স বাড়াকে একটি ধীর, অবিচল, ধারাবাহিক পরিবর্তন হিসেবে কল্পনা করি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বয়স বাড়া ঠিক এমন নয়। বরং এটি একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পর্যায়ক্রমিক ঢেউয়ের মতো। কিছু নির্দিষ্ট বয়সে দেহে ঘটে বড় ধরনের পরিবর্তন—যা হয়তো আমাদের স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে, বয়স ৪৫ থেকে ৫৫–এর মধ্যবর্তী একটি সময়কে এখন মনে করা হচ্ছে বয়সবৃদ্ধির এক মোড় পরিবর্তনের সময়।

চীনা বংশোদ্ভূত ১৪ থেকে ৬৮ বছর বয়সী ৭৬ জন মানুষের শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে এই চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই ব্যক্তিরা দুর্ঘটনাজনিত মস্তিষ্ক আঘাতে মারা গিয়েছিলেন, ফলে তাঁদের দেহের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্লেষণের জন্য ভালো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকেরা তাঁদের দেহের আটটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গতন্ত্র—যেমন হৃদ্‌রোগ, রোগপ্রতিরোধ, পরিপাকতন্ত্র ইত্যাদির নমুনা থেকে প্রোটিন সংগ্রহ করেন। তারপর এসব প্রোটিনের পরিমাণ ও গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে শরীরে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।

প্রোটিনের স্তরে হঠাৎ পরিবর্তন

এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে শরীরের প্রধান ধমনি অর্টা (aorta)–তে। এটি হৃদপিণ্ড থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত বহন করে। গবেষকরা দেখেছেন, এই অঙ্গটির প্রোটিন গঠনে সবচেয়ে বড় ও নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে ৪৫-৫৫ বছর বয়সে।

এই পর্যায়ে বিভিন্ন প্রোটিনের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায় বা কমে যায়, এবং এটি কেবল অর্টাতেই নয়—দেহের অন্যান্য অঙ্গতন্ত্রেও একই ধারা দেখা গেছে। গবেষক দল ধারণা করছে, অর্টা বা রক্তনালিগুলো কেবল রক্ত নয়, বরং বয়স বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে এমন অণুগুলোরও বাহক হিসেবে কাজ করে। ফলে যখন অর্টায় বড় পরিবর্তন ঘটে, তখন তা সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে।

বয়স বাড়া কি তবে ধাপে ধাপে ঘটে?

এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে বয়সবৃদ্ধি একটি সোজাসাপ্টা রেখায় ঘটে না। বরং এটি ঢেউয়ের মতো—যেখানে কিছু বয়সে শরীরে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, আবার কিছু বয়সে তা স্থির থাকে।

এই গবেষণার প্রধান গবেষকদলের পূর্ববর্তী একটি গবেষণায়ও দেখা গিয়েছিল, ৪৪ এবং ৬০ বছর বয়সে শরীরে বয়সজনিত পরিবর্তনের ঢেউ দেখা যায়। তখনো তাঁরা বলেছিলেন যে এই বয়সগুলোতে জেনেটিক তথ্য ও প্রোটিনের গঠনে নাটকীয় পরিবর্তন হয়।

নতুন গবেষণাটি সেই প্রাপ্ত তথ্যকে আরও গভীর করে, এবং প্রোটিন-ভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝাতে চায় যে শরীরের বয়স বাড়ার পথে কিছু বিশেষ বাঁক রয়েছে, যেখান থেকে অনেক কিছু বদলে যেতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ফ্রিৎস লিপম্যান ইনস্টিটিউট, জার্মানির বয়সবৃদ্ধি গবেষক ড. মাজা ওলেস্কা (Maja Olecka) বলেন, “আমরা এখনো জানি না কীভাবে এই পরিবর্তনের সূচনা হয়। তবে এটা নিঃসন্দেহে একটি নতুন এবং আকর্ষণীয় গবেষণাক্ষেত্র।”

তিনি বলেন, “বয়স যে সরলরৈখিকভাবে বাড়ে না, এটি আমরা আগেও অনুমান করেছিলাম, কিন্তু এখন তার প্রমাণ হাতে আসছে। মানুষের শরীরে বিভিন্ন বয়সে নির্দিষ্ট কিছু বায়োলজিকাল পয়েন্টে অনেক বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে।”

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

এই ধরণের গবেষণা আমাদের বয়স ও স্বাস্থ্য বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। যদি আমরা বুঝতে পারি কোন বয়সে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে আমরা বয়সজনিত রোগ যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ইত্যাদি প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারব।

উদাহরণস্বরূপ, যদি ৪৫ বছর বয়সের আগে থেকেই জানা যায় যে অর্টায় বা রক্তনালিতে প্রোটিনের গঠন পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে, তাহলে তখনই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ প্রয়োগ বা অন্যান্য হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই পরিবর্তন ধীর করা সম্ভব হতে পারে।

এর অর্থ হতে পারে, বয়স ৪৫ পেরোনোর আগেই আমাদের উচিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ধারা আরও উন্নত করা এবং বয়সবৃদ্ধির ঝুঁকি কমানোর কৌশল গ্রহণ করা।

ভবিষ্যৎ গবেষণার দিকনির্দেশনা

এই গবেষণা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—বয়স বৃদ্ধির বাঁক বা turning point ঠিক কীভাবে শুরু হয়? কোন প্রোটিন বা অণু এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী?

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য একইভাবে ঘটে? চীনা বংশোদ্ভূত মানুষের উপর এই গবেষণা চালানো হলেও, অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব কতটা একই রকম হবে তা এখনো অজানা।

গবেষকরা আশা করছেন, আরও বড় পরিসরের গবেষণার মাধ্যমে এই পরিবর্তনের কারণ ও প্রভাবগুলো আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বয়সজনিত অসুস্থতা ক্রমবর্ধমান, সেখানে এই ধরণের গবেষণা আমাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বাস্থ্যনীতিতে বয়সভিত্তিক ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, রক্তনালির স্বাস্থ্যের নিয়মিত পরীক্ষা এবং জীবনধারার পরিবর্তনের পরামর্শের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

বিশেষ করে ৪০ বছর বয়স পার করা মানুষদের জন্য একটি জাতীয় স্ক্রীনিং প্রোগ্রাম চালু করলে, এ ধরণের বয়সজনিত ঝুঁকি সনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

উপসংহার

বয়স কেবল একটি সংখ্যা নয়—এই ধারণাকে এই গবেষণা একেবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। এটি দেখিয়েছে, আমাদের দেহ নির্দিষ্ট কিছু বয়সে হঠাৎ করেই এক ধরণের রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যায়। এই পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারলে আমরা শুধু দীর্ঘায়ু নয়, স্বাস্থ্যকর এবং কর্মক্ষম জীবন লাভের পথে এগিয়ে যেতে পারি।

গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, এর প্রভাব অনেক দূর গড়াবে বলে আশা করা যায়। এবং আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একটি নতুন সুযোগ হতে পারে—বয়সবৃদ্ধিকে বোঝা এবং তা নিয়ন্ত্রণ করার পথ খুঁজে পাওয়ার।


তথ্যসূত্র: গবেষণাটি July 2025 সালে প্রকাশিত হয় এবং গবেষকদলটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে তাদের ফলাফল উপস্থাপন করেছেন। বিশেষভাবে বলা যায়, এই গবেষণা আগামী দশকের বয়স ও স্বাস্থ্য গবেষণার ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।

বিজ্ঞানে আগ্রহী পাঠকদের জন্য বার্তা: বয়স একটি গাণিতিক ব্যাপার নয়—এটি একটি জৈবিক রূপান্তরের ফলাফল। চলুন, আমরা এই জটিলতা বুঝে আমাদের জীবনধারাকে আরও স্বাস্থ্যবান করি।


📢 আপনি যদি এই ধরণের বিজ্ঞানের গভীর কিন্তু সহজবোধ্য আলোচনা পড়তে আগ্রহী হন, তাহলে biggani.org–এর নিয়মিত পাঠক হয়ে উঠুন। বিজ্ঞানকে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা আপনার পাশে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles
চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

বয়স ধীর বা দ্রুত বাড়ে কেন? রাজনীতি ও বৈষম্যের অদৃশ্য প্রভাব

বিভিন্ন দেশে বার্ধক্যের গতি কীভাবে ভিন্ন হয় এবং রাজনীতি, বৈষম্য এবং সামাজিক...

চিকিৎসা বিদ্যাজেনেটিকস

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রিসিশন মেডিসিন এবং ফার্মাকোজেনোমিক্স

প্রিসিশন মেডিসিন এবং ফার্মাকোজেনোমিক্স কীভাবে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবাকে রূপান্তরিত করছে তা আবিষ্কার করুন।...

চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

ডিজিটাল সেতুবন্ধন: গ্রাম থেকে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের যাত্রা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিমেডিসিন এবং উইকিমেডিক্সের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশ কীভাবে গ্রামীণ...

পরিবেশ ও পৃথিবীস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও নীল অর্থনীতি।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য এবং নীল অর্থনীতি অন্বেষণ করুন — সুন্দরবন এবং সামুদ্রিক সম্পদ...

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচিকিৎসা বিদ্যা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: প্রতিদ্বন্দ্বী না সহযোদ্ধা?

চিকিৎসা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবাকে রূপান্তরিত করছে। আবিষ্কার...

Three Columns Layout

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact

biggani.org❤️gmail.com

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

বিজ্ঞানী অর্গ (biggani.org) বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে গবেষণা ও বিজ্ঞান নিয়ে বাংলা ভাষায় তথ্য ও সাক্ষাৎকার প্রচার করে – নবীনদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় প্রেরণা দেয়া হয়।

যোগাযোগ:

biggani.org@জিমেইল.com

biggani.org, a community of Bangladeshi scientists, shares interviews and information about researchers and scientists in Bengali to inspire young people in research and higher education.